
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে। এবার চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার ৩০১টি স্থানে দুর্গাপূজা পালন করা হবে। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন মণ্ডপে চলছে প্রতিমা তৈরি, প্যান্ডেল নির্মাণ এবং সাজসজ্জার ব্যাপক প্রস্তুতি। শিল্পী ও কারিগররা পার করছেন ব্যস্ত সময়। মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে রং-তুলির আঁচড়ে প্রতিমার পূর্ণাঙ্গ অবয়ব ফুটিয়ে তোলার মহাযজ্ঞ। মূর্ত হয়ে উঠছে প্রতিমার রূপ।
গত শনিবার ছিল শুভ মহালয়া। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের শুরু হয়। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে মর্ত্যে আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় আয়োজন শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠীর মাধ্যমে শুরু হবে মূল উৎসব।
হিন্দুদের আচার অনুযায়ী মহালয়া, বোধন আর সন্ধিপূজা—এই তিন পর্ব মিলে দুর্গোৎসব। মহালয়ায় মণ্ডপে মণ্ডপে চণ্ডীপাঠ, মঙ্গলঘট স্থাপন, ঢাক-কাঁসা ও শঙ্খ বাজিয়ে দেবীকে আহ্বানের মধ্য দিয়ে সূচনা হবে দুর্গোৎসবের।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কোনো কোনো প্রতিমার ওপর শিল্পীর তুলির শেষ আঁচড় পড়ছে। আবার কোনো কোনো পূজা উদ্যাপন কমিটি তাদের অর্ডার করা প্রতিমা মণ্ডপে বসানোর জন্য নিয়ে গেছেন। পুরোদমে চলছে দুর্গোৎসব উদ্যাপনের প্রস্তুতি। অপরদিকে উপজেলার আনোয়ারা সিটি সেন্টার, দিপুমনি শপিং কমপ্লেক্স, আইপিএল হোসেন নিউ মার্কেট, চাতরী চৌমুহনী ওয়ান মাবিয়া এবং বটতলী ও কাফকো সেন্টারের শপিংমলগুলোতেও ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে।
চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারায় এবার সর্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপের সংখ্যা গত বছরের চেয়ে চারটি কমে ৩০১টি হয়েছে। পূজা উদ্যাপনের সার্বিক নিরাপত্তায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অধিকাংশ মণ্ডপে লাগানো হচ্ছে সিসিটিভি ক্যামেরা।
সদর ইউনিয়নের ইছামতি এলাকার দীপক শিল্পালয়ের প্রতিমাশিল্পী শিবু বলেন, ‘গত প্রায় চার মাস আগে থেকে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছি। এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের তুলির আঁচড়। একেকটি প্রতিমা ২৫ হাজার টাকা থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করি। কোনো কোনো পূজা কমিটি এরই মধ্যে তাদের প্রতিমা ডেলিভারি নিতে শুরু করেছে।’
তিনি জানান, তারা এবার পূজার জন্য প্রায় ১৪টি প্রতিমা তৈরি করেছেন। রাতে নির্বিঘ্নে কাজ করা যায় বলে প্রতিমাশিল্পীরা রাতভর কাজ করেন। কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে এ বছর শিল্পীদের বেগ পেতে হয়েছে। লাইট জ্বালিয়ে প্রতিমা তৈরি করতে হয়েছে।
উপজেলার জয়কালী বাজার, কেয়াগড়, ইছামতি, বারশত কালীবাড়ি, গহিরা ও রায়পুরের বিভিন্ন প্রতিমালয়—সবখানেই শিল্পীর রং-তুলির বর্ণিল কারুকাজে মূর্ত হয়ে উঠছে প্রতিমার রূপ। দিন-রাত চলছে কাজ, দম ফেলার অবসরটুকু নেই শিল্পীদের।
কয়েকটি শিল্পালয় ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটিতে ১০টি থেকে ২৫টি পর্যন্ত প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে। শিল্পালয়ের চারপাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা এবং লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা। রঙের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এখন চলছে সাজসজ্জা। তারপর মহাষষ্ঠীর দিনে মৃন্ময়ী মূর্তি যাবে মণ্ডপে মণ্ডপে।
মৃৎশিল্পী শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা আষাঢ়ের শুরু থেকে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছি। মাটি আর রঙের কাজ আমাদের শেষ হয়ে গেছে। এখন প্রতিমা সাজাচ্ছি। এরপর গহনা আর শাড়ি পরানো হবে। এবার আমরা ১৪টি মণ্ডপের জন্য প্রতিমা তৈরি করেছি।’
দীপক শিল্পালয়ের প্রধান মৃৎশিল্পী অভি জানান, পূজার সময় ঘনিয়ে এসেছে। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে কাজ করতে অনেক সমস্যা হয়েছে। অন্যান্যবারের তুলনায় এবার প্রতিমা তৈরিতে খরচ বেড়েছে। শুকনা খড় থেকে শুরু করে পাটের রশি—সবকিছুর দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। রঙের দাম বেড়েছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার বেশি। তারপরও সবার অর্ডার নিয়েছি, কাজ করতে ভালো লাগে। শেষ মুহূর্তে সাজসজ্জার কাজ চলছে। ১৬ অক্টোবর মণ্ডপে চলে যাবে প্রতিমা।
আনোয়ারা উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের প্রতিনিধি নির্মল কান্তি শীল বলেন, ‘আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আনোয়ারার ১১২টি পূজামণ্ডপে প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতিমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। বাকিগুলোতেও কাজ চলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে। আশা করছি, শান্তি, সম্প্রীতি ও উৎসবমুখর পরিবেশে এবারের দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে।’
তিনি আরও বলেন, জাতি, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে আনোয়ারার পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুপ্রিয় মজুমদার দোলন বলেন, ‘আমরা তিন মাস আগে থেকেই পূজার প্রস্তুতি নিয়েছি। পূজার ছুটি বাড়াতে উৎসবের মাত্রা বাড়বে।’ এবারের পূজায় কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তাঁদের মধ্যে নেই বলেও জানান তিনি।
এদিকে আনোয়ারা থানা-পুলিশ জানিয়েছে, দুর্গাপূজা উপলক্ষে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। উৎসব চলাকালে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে টহল, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং সাদাপোশাকে নজরদারির পরিকল্পনা রয়েছে।
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী বলেন, ‘আনোয়ারা থানার আওতায় ৩০১টি স্থানে শারদীয় দুর্গাপূজা উদ্যাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১২টি স্থায়ী মন্দির এবং ১৮৮টি ঘটপূজার স্থান। নিরাপত্তায় ছয়টি টহল দল মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ও অধিক পূজামণ্ডপ থাকা এলাকায় অতিরিক্ত টহল এবং সাদাপোশাকে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে।’
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি ও পুলিশ সুপারের নির্দেশনা অনুযায়ী, শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা উদ্যাপন নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকবে বলেও জানান তিনি।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ