এক সময়ের চরম দারিদ্র্যে জীবন কাটানোর মানুষগুলোর জীবন বদলে দিয়েছে সমতলের চা শিল্প। বদলে গেছে আর্থ-সামাজিক অবস্থাও। হাজার হাজার একর অনাবাদি গো-চারণ পতিত জমি হয়ে উঠেছে সমতলের সবুজ চায়ের ভূ-স্বর্গ। চাঙ্গা অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটন শিল্পের নতুনমাত্রা। বাগানে তৃতীয় অঞ্চল হলেও চা উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে দুই যুগের চায়ের নীরব বিপ্লবে বদলে গেছে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের অর্থনীতি।
চা চাষ শুরু যেভাবেতৎকালীন পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক রবিউল ইসলামের তত্ত্বাবধানে পঞ্চগড়ে শুরু হয় পরীক্ষামূলকভাবে চা চাষ। প্রতিবেশী দেশ ভারতের দার্জিলিংয়ের চা বিখ্যাত হওয়ায় এ অঞ্চলে কেন চা আবাদ সম্ভব নয় এমন পরিকল্পনা নিয়ে শুরু হয় চা চাষ। প্রথমে টবে, পরে জমিতে চায়ের চাষ করা হলে আসে সফলতা। সে সফলতা থেকে পঞ্চগড়ে ১৯৯৯ সালে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষের পরিকল্পনা করা হয়। সে বছরের অক্টোবরে বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিট ও বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের একটি বিশেষজ্ঞ দল পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলায় জরিপ চালিয়ে চা চাষের সম্ভাবনা সম্পর্কে নিশ্চিত হন। জরিপ কমিটি পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রায় ৪০ হাজার একর জমিতে চা চাষের সম্ভাবনা নির্ধারণ করেন।
বাণিজ্যিকভাবে চা-বাগানের যাত্রা২০০০ সালের দিকে তেঁতুলিয়া টি কোম্পানি লিমিটেড ও কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের হাত ধরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়। ২০০১ সালে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) একটি উপকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়ে পঞ্চগড়ে মতিয়ার রহমান, সিরাজুল ইসলাম, ইসহাক আলী মন্ডল, আবদুর রহমান ও আবুল হোসেনসহ ছয় থেকে সাতজন ক্ষুদ্র চাষি চা চাষ শুরু করেন। এরপর থেকেই বাড়তে থাকে চা চাষের পরিধি।
এক সময়ের পতিত গো-চারণ ভূমি হয়ে উঠে বিস্তৃত সবুজ চা-বাগান। চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিকল্পনায় বাংলাদেশ চা বোর্ড কৃষকদের চা চাষে উদ্বুদ্ধ করতে ঋণ ও বিভিন্ন উৎসাহ প্রদান করেন। বাগানের কাঁচা পাতা বিক্রি করে হাতে নগদ অর্থ আসার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের বাড়ির আঙিনাটুকুও হয়ে উঠেছে চা-বাগান।
চা বাগান ও জমির পরিমাণচা বোর্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০০৬ সালে পঞ্চগড়ের চা আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯২৫ একর, যা বর্তমানে ১৩ গুণ বেড়ে হয়েছে ১২ হাজার ৭৯ একর। চায়ের চাষ থেকে শুধু সবুজ পাতা উৎপাদন হচ্ছে বর্তমানে প্রায় ৯ কোটি কেজির বেশি এবং চা তৈরি হচ্ছে বছরে ২ কোটি কেজির বেশি। বর্তমানে জেলায় মোট ৯টি বড় ও ৮ হাজার ৩৫৫টি ক্ষুদ্রায়তনের চা-বাগান রয়েছে। বর্তমানে জেলায় ২৩টি চা প্রক্রিয়াজাত কারখানা চালু রয়েছে। আরও বেশ কয়েকটি কারখানা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া চা বাগান দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় অন্যান্য ফসলের তুলনায় চা চাষের আগ্রহের কারণে হারিয়েছে এ অঞ্চলের আখের চাষ। চা আবাদ ঘিরে ছোট-বড় বিভিন্ন পরিসরে চা-বাগান গড়ে ওঠায় একদিকে যেমন বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে মজবুত হচ্ছে এ অঞ্চলের অর্থনীতির ভিত। ফলে চা-বাগান সংশ্লিষ্টদের জীবনমানের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে এ জেলায়। এতে করে দুই যুগে বদলে যাওয়া পঞ্চগড়ে এখন যেদিকে চোখ যাবে দেখা মিলবে দিগন্ত জুড়ে বিস্তৃত সমতলের চা বাগান। সমতলের এ চা শিল্পের পরশে বদলে গেছে এ জেলার চিত্র।
চা উৎপাদনে দ্বিতীয়, বাগানে তৃতীয় অঞ্চলচট্টগ্রাম ও সিলেটের পর চা উৎপাদনে দ্বিতীয় অঞ্চল হয়ে উঠেছে এ জেলা। তবে চা বাগানের ক্ষেত্রে তৃতীয় চা অঞ্চল এ জেলায়। তবে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক কারণে বর্তমানে কমেছে চা উৎপাদন। ২০২৩ মৌসুমের তুলনায় কমেছে চায়ের উৎপাদন। গত মৌসুমে (২০২৪) উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার সমতল ভূমিতে উৎপাদিত হয়েছে ১ কোটি ৪৩ লাখ ৯০ হাজার ১৫১ কেজি চা। যা আগের মৌসুমের চেয়ে ৩৫ লাখ ৫৭ হাজার কেজি কম। আর গত মৌসুমে জাতীয় উৎপাদনের ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ চা সমতল ভূমি থেকে যুক্ত হলেও এবার যুক্ত হয়েছে ১৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
অতিরিক্ত খরা ও পাতায় পচন রোগ দেখা দেয়ায় কমেছে উৎপাদন। তবে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বেড়েছে পাতার চাহিদা। প্রত্যাশিত দামেই কৃষকরা কারখানায় পাতা বিক্রি করতে পারায় স্বস্তিতে থাকলেও উৎপাদন নিয়ে তারা কিছুটা চিহ্নিত রয়েছেন বলে জানিয়েছে চা চাষিরা।
চা বাগানে মিশ্র ফসল চাষে লাভবান কৃষকসবুজ চা পাতা ছাড়াও চাষিরা চা-বাগানে মিশ্র ফসল চাষ করে লাভবান হচ্ছে। তারা চা- বাগানে এখন বিভিন্ন উন্নত প্রজাতির আম, মাল্টা, পেঁপে, সুপারি, তেজপাতা, আমলকী ও মেহগনিসহ নতুন বাগানে বিভিন্ন শাক-সবজি চাষ করে বাড়তি আয় করেছেন। গত এক দশকে চা-বাগানে এসব মিশ্র ফসল চাষ করে সফল হয়েছেন অনেক চাষি।
কর্মসংস্থানচা-শিল্পের বিকাশের পর থেকে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৬ সালে যেখানে মাত্র ১ হাজার ৪৭৫ জন শ্রমিক এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, বর্তমানে তা বেড়ে ১৫ হাজারে উন্নীত হয়েছে। কাঁচা চা-পাতা বিক্রি করে ক্ষুদ্র কৃষক বছরে একরপ্রতি ২-৩ লাখ টাকা আয় করছেন। বছরে এই শিল্প থেকে প্রায় ২৮০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে, যা চা খাতে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়। চা চাষে যেমন স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেছে তেমনি এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত চা-শ্রমিকদের জীবনও বদলে গেছে। চায়ের ওপর নির্ভর করছে তাদের জীবন-জীবিকা।
জেলার লক্ষাধিক মানুষ জড়িয়ে পড়েছেন চা শিল্পে। বেকারদের একটি বড় অংশ চাকরি ছেড়ে দিয়ে চা চাষে বিনিয়োগ করছেন। এতে করে হাজার হাজার নারী-পুরুষের কাজের কর্মসংস্থান হয়েছে। অর্থনীতিতেও স্বাবলম্বী হয়েছেন তারা। চা অর্থকরী ফসল হিসেবে বছরের নয় মাস চলে বাগানের বিভিন্ন কাজ। বাগানের পরিচর্যা হিসেবে ফ্লাইং কাটিং অর্থাৎ গাছের মাথা ফ্লাইং কাটিং, সার ও কীটনাশক স্প্রে, পানি নিষ্কাশনের কাজ করা হয়। তিন মাস বাগান পরিচর্যার পর নতুন কুঁড়ি গজে উঠে। এর মাস খানেকের মধ্যেই শুরু হয় পাতা তোলা। শ্রমিকরা বাগানে বাগানে দলবেঁধে কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা চুক্তিতে পাতা তুলেন। দিন শেষে শ্রমিকদের হাতে আসে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মতো। পাতার দাম বাড়লে শ্রমের দামও বেড়ে যায়। এছাড়াও কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে চা কারখানাগুলোতেও।
শ্রমিক থেকে চা বাগানের মালিকচা শিল্প ঘিরে শুধু চা চাষি ও চা শ্রমিকের অর্থনৈতিক পরিবর্তন ঘটেনি। শ্রমিক থেকে অনেকেই হয়ে উঠেছেন চা বাগানের মালিক। নিজের জমি না থাকলেও অন্যের কাছ থেকে দীর্ঘ মেয়াদে জমি লিজ নিয়ে বাগানের মালিক হয়েছেন। অর্থনৈতিক সচ্ছলতায় বদলে গেছে আর্থ সামাজিক অবস্থা। ছনের ছাউনির জায়গায় ইট-কংক্রিটের ঘরবাড়ি। উন্নত হয়েছে গ্রামীণ পরিবেশ। আধুনিকতার শহরের আদলে গড়ে উঠছে চা গ্রাম।
বিশ্বের সেরা চা পঞ্চগড়েরপৃথিবীর সেরা চা উৎপাদিত হচ্ছে এখানে। বাংলাদেশে একমাত্র প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে ১০০ ভাগ অর্গানিক চা উৎপাদন করছে কাজী অ্যান্ড কাজী টি। তাদের চা বাগান সম্পূর্ণ কম্পোজিট টি এস্টেট। আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশে অর্গানিক চা উৎপাদনে খ্যাতি পেয়েছে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেটের। এই অর্গানিক চা উৎপন্ন হয়ে বিক্রি হচ্ছে লন্ডনের হ্যারোড অকশন মার্কেটে। রপ্তানি হচ্ছে দুবাই, জাপান ও আমেরিকায়। দেশীয় বাজারে চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে এখানকার চা।
গড়ে উঠছে তৃতীয় চা নিলাম কেন্দ্রচট্টগ্রাম ও শ্রীমঙ্গলের পর দেশের চায়ের তৃতীয় নিলাম কেন্দ্র গড়ে উঠছে এ জেলায়। উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাট থেকে উৎপাদিত চা এই নিলাম কেন্দ্রে মাধ্যমে বিক্রি হচ্ছে এখানকার চা। নিলাম কেন্দ্র ঘিরে স্থাপিত হয়েছে ব্রোকার ও ওয়্যার হাউজ।
বেড়েছে পর্যটনের সম্ভাবনাসমতলে চা বাগান ঘিরে সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে পর্যটন শিল্পের। গ্রামীণ পর্যটন হিসেবে ইকো ট্যুরিজম ও গ্রিন ট্যুরিজমের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে কৃষিতে চা শিল্প। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, “দেশের উত্তরের সীমান্ত জনপদ পঞ্চগড়ে গড়ে উঠা চা শিল্প গ্রামীণ পর্যটনে নতুনমাত্রা দিয়েছে। চা শিল্পকে কৃষি পর্যটনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রতি বছর সিলেট, মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রামে চা-বাগান দেখতে পাড়ি দেয় লাখো পর্যটক। সিলেট-চট্টগ্রামের মতোই চা বাগান পর্যটনে নতুনমাত্রা যোগ করেছে পঞ্চগড়ে। সবুজ চা শিল্প ঘিওের টি ট্যুরিজমের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় চা বাগানে গড়ে উঠছে ছোট ছোট রিসোর্ট। ইতোমধ্যে তেঁতুলিয়া উপজেলার কালান্দিগঞ্জে মহাসড়কের ধারে গড়ে উঠেছে গ্রীণ টি ভ্যালি নামের একটি রিসোর্ট। এতে করে চা পর্যটনে সমৃদ্ধ ঘটছে এ অঞ্চলে।”
বাংলাদেশ চা বোর্ডের জেলা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকর্তা আমির হোসেন বলেন, “সমতল ভূমিতে চা চাষে উত্তরাঞ্চলের ৫টি জেলা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। ১৯৯৬ সালে এ জেলায় প্রথম চা চাষের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। ২০০০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ক্ষুদ্র পর্যায়ে চা চাষ। এ অঞ্চলে দিনদিন চা চাষ ও উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে তা সিলেটের পর দ্বিতীয় অবস্থানে এসেছে। পঞ্চগড়ের চা শিল্পকে অনুসরণ করে ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, দিনাজপুর ও নীলফামারীতে চা উৎপাদনে সমৃদ্ধ করেছে রংপুরের পাঁচ জেলা।”
তিনি আরো বলেন, “আমরা চাষীদের চা চাষে প্রশিক্ষিত করতে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দিতে ক্যামেলিয়া খোলা আকাশ স্কুলের মাধ্যমে কর্মশালা করছি। চাষিদের সমস্যা সমাধানে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপস চালু করা হয়েছে। এছাড়া আঞ্চলিক কার্যালয়ে একটি পেস্ট ম্যানেজমেন্ট ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে চাষিদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, রোগবালাই ও পোকা দমনে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।”