
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিসে আক্রান্ত, যার মধ্যে অন্তত ১০ লাখ ব্যক্তি হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে সংক্রমিত।
এই রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ—মাত্র এই ১০ লাখ রোগীর পরীক্ষায়ই খরচ হচ্ছে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বজুড়েই হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত, এবং প্রতি সেকেন্ডে একজন ব্যক্তি এই রোগে মৃত্যুবরণ করছেন।
এই প্রেক্ষাপটে, আজ ২৮ জুলাই ২০২৫ পালিত হচ্ছে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস।
১৯৭৬ সালে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আবিষ্কার করে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী বারুচ স্যামুয়েল ব্লমবার্গ এর নির্ণয় পদ্ধতি ও প্রতিরোধে টিকা উন্নয়ন করেন। তার জন্মদিনকে স্মরণ করেই প্রতিবছর এই দিনটি পালিত হয়।
হেপাটাইটিস শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ ‘হেপার’ (যকৃৎ) এবং ‘টাইটিস’ (প্রদাহ) থেকে। এ রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো হলো জ্বর, ক্ষুধামান্দ্য, বমি ভাব, পেটে ব্যথা এবং পরবর্তী পর্যায়ে জন্ডিস, গাঢ় প্রস্রাব ও যকৃত অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখছে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস। দেশে প্রতি বছর লিভারের রোগে আক্রান্ত হয়ে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে এবং এই রোগের চিকিৎসা বাবদ ব্যয় হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের ১০ থেকে ১২ শতাংশই লিভার রোগে আক্রান্ত, যার বড় একটি অংশ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসজনিত।
২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নাল The Lancet-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে যকৃত ক্যান্সারের ৪২ শতাংশ রোগী দীর্ঘমেয়াদে হেপাটাইটিস বি এবং ৩১ শতাংশ হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে সংক্রমিত ছিলেন। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ জীবদ্দশায় হেপাটাইটিস বি ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয় এবং প্রায় ৬ শতাংশ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি এ সংক্রমণ বহন করেন। এটি একটি ডিএনএ-ভিত্তিক ভাইরাস, যা দীর্ঘমেয়াদী যকৃতের রোগ ও ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র গ্লোবাল হেলথ সেক্টর স্ট্র্যাটেজির (GHSS) আওতায় ২০২০ সালে শিশুদের টিকাদান ও প্রতিরোধ কর্মসূচির মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে চার বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার নেমে এসেছে ০.৯৪ শতাংশে। প্রতি লাখে নতুন সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে ২০ জন এবং মৃত্যু ১০ জনে।
২০২৫ ও ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা আরও কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর মধ্যে রয়েছে—
১. ২০২৫ সালের মধ্যে চার বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ হার ০.৫ শতাংশে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ০.১ শতাংশে নামিয়ে আনা।
২. প্রতি লাখে নতুন সংক্রমণ কমিয়ে ২০২৫ সালে ১১ জন এবং ২০৩০ সালে ২ জনে নামানো।
৩. মৃত্যু হার কমিয়ে ২০২৫ সালে প্রতি লাখে ৭ জন এবং ২০৩০ সালে ৪ জনে নামিয়ে আনা।
৪. জন্মের পরপরই প্রথম ডোজসহ শিডিউলভিত্তিক সব টিকার কভারেজ ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি নিশ্চিত করা।
বর্তমানে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে সংক্রমিত রোগীদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ রোগী সঠিকভাবে নির্ণয় ও চিকিৎসা পান।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সেলিমুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, “হেপাটাইটিস একটি প্রাণঘাতী রোগ। বিশেষ করে বি ও সি ভাইরাসের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এটি খাবার ও পানির মাধ্যমে সহজেই ছড়াতে পারে। তাই রোগ নির্মূলে বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি রোগীকে শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।”