বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
   
শিরোনাম:
বিএনপি জামায়াতের মতবিরোধে ফায়দা নিচ্ছে আওয়ামী দোসররা
উমর ফারুক
প্রকাশ: সোমবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৪, ১১:৪৬ AM আপডেট: ২৩.১২.২০২৪ ১১:৫২ এএম

# দখলদারি- চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপির কয়েক শ’ নেতা বহিস্কার 
# দোসরদের জিম্মাদার হচ্ছেন বিএনপি নেতারা
# একই ইস্যূতে বহিষ্কৃত হয়নি জামায়াতের কোনো নেতা


বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে প্রায় ২৫ বছরে মিত্রতা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই মিত্রতার সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। দল দুটির নেতারা সম্প্রতি একে অপরকে কটাক্ষ করছেন। রাজনৈতিক বিষয়ে বিপরীতমুখী অবস্থান নিচ্ছেন। বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারকে দ্রুততম সময়ে নির্বাচন দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। বিপরীতে জামায়াত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে চাপ না দেওয়ার কথা বলছে। রাজনৈতিক বিরোধীদের ক্ষমা নিয়েও দল দুটির দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। আর অপ্রকাশ্যে চলছে বেসামরিক প্রশাসন, পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিজস্ব লোকের পদায়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে অবস্থান সুসংহত করা নিয়ে ছাত্রদলের সঙ্গে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরোধও অনেকটা প্রকাশ্য। বিএনপির ধারণা, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে বেশি সমর্থন পাচ্ছে জামায়াত। এদিকে, দলের শৃঙ্খলা ঠেকাতে ৫ আগষ্টের পর কয়েকশত নেতাকর্মীকে বহিস্কার করেছে বিএনপি। এতে দলের শীর্ষনেতাসহ তৃণমূলের নেতারাও রয়েছেন। কিন্তু একই ইস্যূতে জামায়াতের একজন নেতাকর্মীও বহিস্কার হয়নি। বিএনপি জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে বিভিন্ন মহলের আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে। বিএনপি জামায়াতের মতবিরোধে ফায়দা নিচ্ছে আওয়ামী দোসররা।

এবিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন,  বিএনপি বৃহৎ  রাজনৈতিক দল। লাখ লাখ নেতাকর্মীর মধ্যে যারা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কাজ করেছেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে দেশের মানুষের কাছে বিএনপির ইমেজ চাঙা হয়েছে। কারন, অপরাধী যেই হোক তার ঠিকানা বিএনপি হতে পারে না। 

তিনি বলেন, জামায়াত তাদের দলের সংবিধান মেনে রাজনীতি করে। দেশের বিভিন্ন সংকটে বিএনপির সাথে তারা এগিয়ে আসে। তাদের কর্মকান্ড নিয়ে দেশের জনগণ অবগত। আর নির্বাচনের রূপরেখা এখনো সরকার পরিস্কার করেনি। আগে  রোডম্যাপ আসুক। তার পর নির্বাচন নিয়ে খোলামেলা কথা হবে। দেশের মানুষ তা জানতে পারবে । এখানে গোপনের কিছু নেই। 

এদিকে, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে দলীয়ভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়া হলেও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা তাদের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি এই তালিকায় ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিবসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার নামও এসেছে। এ ছাড়া ঢাকা জেলা ও মহানগর, চট্টগ্রাম, নেত্রকোনা, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জসহ কয়েকটি জেলার স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীরা। তবে অভিযুক্তরা বলছেন, রাজনৈতিকভাবে তাদের ঘায়েল করতে দলের ভেতর থেকে কেউ কেউ মিথ্যা অভিযোগ তুলছে। 

এবিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বিএনপিতে কোনো অনুপ্রবেশকারির জায়গা হবে না। এবিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 

নির্বাচন নিয়ে বিএনপি ও তার মিত্র জামায়াতে ইসলামী পর¯পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। বিএনপি দ্রুত সংসদ নির্বাচনের তাগিদ দিলেও তাড়াহুড়ো চায় না জামায়াত। গত ৫ আগস্টের পর রাজনীতির মাঠে বিএনপির সঙ্গে নানা কারণে জামায়াতের দূরত্ব বাড়ছে। সম্প্রতি বিএনপি যে অবস্থান নিচ্ছে ঠিক তার উল্টো মতামত দিচ্ছে জামায়াত। এমন বৈরী অবস্থানে দুই দলের জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। জামায়াত ৩০০ আসনে এককভাবে কিংবা ইসলামী জোট করে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্প্রতি ভোটার তালিকা হালনাগাদে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিএনপি ভোটার তালিকা প্রণয়নে বাড়ি বাড়ি যাওয়ার প্রয়োজন দেখছে না। দলটি প্রযুক্তির মাধ্যমে তালিকা আপগ্রেড করার পরামর্শ দেয়। বিএনপির এই মতের উল্টো মত দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সংসদীয় আসনের পুনর্বিন্যাস এবং ভোটার তালিকা হালনাগাদে নির্বাচন কমিশনকে যৌক্তিক সময় দেওয়ার কথা বলেছেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তার মতে, যে যুব সমাজের মাধ্যমে দেশে পরিবর্তন এসেছে, তাদের সবাইকে অবশ্যই এবার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন হচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা। ‘আগে সংস্কার, পরে নির্বাচন’, ‘নির্বাচন নিয়ে তাড়াহুড়ো নয়’ - তিন মাস ধরে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা এমন কথা বলে এলেও নভেম্বরের শেষে দলটির নায়েবে আমির মুজিবুর রহমান ‘যত দ্রুত সম্ভব সংস্কার শেষ করে’ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলেন। গত ২৯ নভেম্বর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে দলের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, আমি বর্তমান উপদেষ্টা সরকারকে বলব, আপনারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংস্কার কাজ শেষ করে তারপরে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। এটা যদি না হয়, তাহলে এ নির্বাচন তো নির্বাচন হবে না। তার দুই সপ্তাহের মাথায় জামায়াত আমির শফিকুর রহমান নির্বাচনের জন্য সরকারকে যৌক্তিক সময় দেওয়ার কথা বললেন। 

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জামায়াত একবার বলে সংস্কার দরকার, আবার বলে নির্বাচন দরকার। একেকবার একেক কথা বলছে। তারা আসলে ফাইনালি কী চায়-তা বোঝা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার হালনাগাদের পরিবর্তে মেশিনে করতে বলেছি। জামায়াত বাড়ি বাড়ি হালনাগাদের পক্ষে। এটা বাদানুবাদ তৈরি করছে কি না, এ নিয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা করা যাবে না।

খোজ খবর নিয়ে জানা গেছে, লুটপাট-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদই নিরাপত্তা দিচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতাদের। গত সাড়ে চারমাসের চিত্র বলছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বহুদোষে দোষী আওয়ামী লীগের নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে বিএনপি নেতারা। বিনিময়ে কী পাচ্ছে তা জন্রেসাতি আছে। ঠিকাদারী, ঘাট-বাজার নিয়ন্ত্রণ, বদলি-তদবির সব চলমান। কীভাবে? তা খোলাসা করেছে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বর্তমান নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেছেন, চাঁদাবাজি, দখলদারি সব চলছে আগের মতোই শুধু পরিবর্তন হয়েছে চাঁদাবাজ-দখলদার। এর লাগাম ধরতে ৫ আগস্টের পরপরই বিএনপির শীর্ষ নেতা প্রথমদিকে দলীয় চাঁদাবাজদের বহিষ্কার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু এখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

হাটে-ঘাটে-মাঠে এখন কমন বাক্য ‘আগে ওরা ছিলো এখন এরা’। ওরা মানে আওয়ামী লীগ তা পরিষ্কার করলেও এরা কারা তা বলতে নারাজ। অফিস-আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য সেক্টরে দোসরদের দিকে আঙ্গুল তুলতেই বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা বলেন ‘এরা আমার লোক’। আর দলটির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে সোজাসাপ্টা মনে হচ্ছে- অতীত ভুলে নতুন হিসাব কষছেন তারা। মাঠ ফাঁকা। আগত সরকার তারাই গঠন করবেন। শুধু নির্বাচনের বাকি। তাই বাক্স ভরতে চাই ভোট। দেশের ৩৫/৪০ভাগ ভোট ১৪ দলীয় জোটের। তাই কথায় কাজে জোটটি বিরাগভাজন না হয়। আওয়ামী লীগ-জাপার ভোট যেনো অন্যের বাক্সে না পড়ে। এতে বিরক্তির সুর অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানেরও। পদে পদে বাধা। ফলে ‘এ বস্তার চাল ও বস্তায়, এ ঘাটের জল ও ঘাটে ঢালা’-এ হচ্ছে সংস্কার। 

অপরদিকে, গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পালানোর পরপরই ‘বাসর রাতে বিড়াল মারা’র গল্পের মতোই সব কিছু নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ব্যাংক-বীমা কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয়, ফাউন্ডেশন, হাউজিং কোম্পানি, টেলিভিশনসহ যা যা হাতছাড়া হয়েছিল কড়ায়-গ-ায় তা ফিরিয়ে নিয়েছে। সংস্কার প্রক্রিয়ায় শরিক হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন পছন্দের লোক। তারা এখন সংগঠনের পরিধি বাড়ানোর কাজে ব্যস্ত। জামায়াতের আমীর ইতোমধ্যে দেশের প্রায় অর্ধেক জেলা-মহানগরে হাজির হয়েছেন। ভোটের চিন্তা মাথায় রেখে প্রস্তুত করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীদের।

দলটির কোনো নেতাই চাঁদাবাজির দায়ে বহিষ্কৃত হয়নি। আগামীতে ভোট টানতে পতিত আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দিয়েছেন জামায়াত আমীর। সংগঠনের প্রতি সমর্থন পেতে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গেও মতবিনিময় সভা করছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারত রুষ্ট হয়-এমন বাক্যও ছাড়ছেন না সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা। তবে দেশের মাটিতে এ সময়ে বিএনপিকেই ভোটের মাঠের প্রতিপক্ষ মনে করছে জামায়াত। যে কারণে আকারে-ইঙ্গিতে সমালোচনার পিন ঠুকে দিচ্ছে বিএনপির গায়ে। হিসাবটা এমন- দাঁড়িপাল্লায় যেনো পড়ে আওয়ামী লীগ সমর্তিত ভোটারদের সীল। 

স্বদেশ প্রতিদিন/এমআর






Loading...
Loading...
এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ  
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close
অনুসরণ করুন
     
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড -এর পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক সিটি পাবলিশিং লি, আর কে মিশন রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : [email protected], [email protected]
🔝
close