
ইউরোপ কাঁপানো ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জীবনে একসময় ছিল সামরিক বিজয়, বিশাল সাম্রাজ্য আর অপরিসীম ক্ষমতা। কিন্তু ইতিহাসের চাকা ঘুরে তাঁকেই শেষ পর্যন্ত কাটাতে হয় দূরবর্তী এক দ্বীপে বন্দিজীবন। ১৮১৫ সালের ১৫ অক্টোবর ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস নর্থাম্বারল্যান্ড সেন্ট হেলেনা দ্বীপের কাছে পৌঁছায়। ওয়াটারলু যুদ্ধে পরাজয়ের পর শুরু হওয়া নেপোলিয়নের নির্বাসিত জীবনের এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। তবে দ্বীপে তাঁর অবতরণের তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে ১৬ ও ১৭ অক্টোবরের উল্লেখও পাওয়া যায়। সূত্র: Historic UK, Napoleon.org।
ওয়াটারলুর পরাজয়ে পতন
১৮১৫ সালের ১৮ জুন বেলজিয়ামের ওয়াটারলু যুদ্ধে ব্রিটিশ ও প্রুশীয় বাহিনীর কাছে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন নেপোলিয়ন। এর মধ্য দিয়ে ইউরোপে তাঁর পুনরায় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ভেঙে যায়। এর আগে তাঁকে ভূমধ্যসাগরের এলবা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়েছিল। সেখান থেকে পালিয়ে ফ্রান্সে ফিরে এসে আবারও ক্ষমতা দখল করেন তিনি। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন ইতিহাসে ‘শতদিন’ নামে পরিচিত।
কিন্তু ওয়াটারলুর পরাজয়ের পর আর ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাননি নেপোলিয়ন। ইউরোপের মিত্রশক্তি এবার তাঁকে এমন এক দূরবর্তী স্থানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, যেখান থেকে ফ্রান্সে ফিরে এসে নতুন করে ক্ষমতা দখলের সুযোগ পাওয়া কঠিন হবে।
আটলান্টিকের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সেন্ট হেলেনা
আটলান্টিক মহাসাগরের দক্ষিণাংশে অবস্থিত সেন্ট হেলেনা আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার দূরে। দুর্গম পাহাড়, খাড়া উপকূল আর চারপাশে বিস্তৃত সমুদ্র দ্বীপটিকে প্রাকৃতিকভাবেই বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ব্রিটিশদের সামরিক নজরদারির কারণে নেপোলিয়নের পক্ষে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন।
দ্বীপে পৌঁছানোর পরপরই অবশ্য তাঁকে লংউড হাউসে রাখা হয়নি। প্রথমে তিনি ব্রায়ার্স প্যাভিলিয়নে অবস্থান করেন। পরে ১৮১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁকে লংউড হাউসে নেওয়া হয়। সেখানেই জীবনের শেষ কয়েক বছর কাটে একসময়ের এই পরাক্রমশালী সম্রাটের।
কঠোর নজরদারি ও নিঃসঙ্গ জীবন
নেপোলিয়নের বন্দিজীবন ছিল নানা বিধিনিষেধে ঘেরা। তাঁর চলাফেরা, যোগাযোগ ও চিঠিপত্রের ওপর নজর রাখা হতো। ১৮১৬ সালে ব্রিটিশ গভর্নর হাডসন লো দায়িত্ব নেওয়ার পর নজরদারির বিষয়টি আরও আলোচিত হয়ে ওঠে। নির্বাসিত জীবনে নেপোলিয়ন তাঁর সময়ের বড় একটি অংশ কাটান স্মৃতিচারণ, পড়াশোনা ও সহযোগীদের কাছে নিজের জীবনের নানা ঘটনা বর্ণনা করে।
একসময় যাঁর নির্দেশে ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনী অগ্রসর হতো, তাঁকেই জীবনের শেষ দিনগুলোতে কাটাতে হয় বিচ্ছিন্ন দ্বীপের সীমিত পরিসরে। ক্ষমতা ও সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবনে নেমে আসে দীর্ঘ একাকিত্ব।
সেন্ট হেলেনাতেই শেষ নিঃশ্বাস
দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর নির্বাসনে থাকার পর ১৮২১ সালের ৫ মে সেন্ট হেলেনায় মৃত্যুবরণ করেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫১ বছর। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় রাজনীতি ও যুদ্ধের ইতিহাসে এক প্রভাবশালী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।
নেপোলিয়নের নির্বাসন কেবল একজন সম্রাটের ব্যক্তিগত পরিণতির গল্প নয়; এটি ক্ষমতার উত্থান-পতন, সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। একসময় যিনি ইউরোপের মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন, জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাঁকেই আশ্রয় নিতে হয়েছিল আটলান্টিকের এক নিঃসঙ্গ দ্বীপে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি