
আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা-২০২৬ জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন এই আচরণবিধিতে নির্বাচনী প্রচারণা, ব্যয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার, সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ এবং ভোটারদের প্রভাবিত করার বিষয়ে বেশ কিছু কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার নিষিদ্ধ করা। কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থক নির্বাচনী প্রচারের উদ্দেশ্যে পোস্টার ঝুলাতে বা সাঁটাতে পারবেন না। একই সঙ্গে ভবন, দেয়াল, গাছপালা, বেড়া, বিদ্যুতের খুঁটি, সেতু, কালভার্টসহ বিভিন্ন স্থাপনায় প্রচারসামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত সব ধরনের প্রকাশ্য মিছিল ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ থাকবে। বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, নৌযান কিংবা ট্রেন ব্যবহার করে মিছিল বা শোডাউনও করা যাবে না। নির্বাচনী প্রচারণায় হেলিকপ্টারসহ যেকোনো ধরনের আকাশযান ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা চালাতে পারবেন। এজন্য প্রচারণা শুরুর আগে কোন কোন প্ল্যাটফর্ম বা মাধ্যমে প্রচার চালানো হবে, সে বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। অনলাইন প্রচারণায় যে অর্থ ব্যয় হবে, সেটিও প্রার্থীর মোট নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ডিজিটাল প্রচারণার ক্ষেত্রে এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-এর অপব্যবহার ঠেকাতে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষমূলক কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক বক্তব্য বা কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচনবান্ধব পরিবেশ নষ্ট করতে পারে—এমন কনটেন্ট প্রচারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ভোটারদের প্রভাবিত করতে অর্থ, খাবার-পানীয় কিংবা উপহারসামগ্রী বিতরণেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পাশাপাশি ধর্মের অপব্যবহার, পেশিশক্তির প্রয়োগ, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো এবং ব্যক্তিগত চরিত্রহননমূলক অপপ্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি কার্যালয়েও কোনো ধরনের নির্বাচনী প্রচারণা চালানো যাবে না। একইভাবে সরকারি যানবাহন, মাইক বা অন্যান্য সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো নিষিদ্ধ।
নির্বাচনের দিন ভোটারদের কেন্দ্রে আনা-নেওয়ার জন্য কোনো ধরনের যানবাহন ভাড়া বা ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ থাকবে। নির্বাচনী ক্যাম্প ও মাইক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত নিয়ম ও সীমা অনুসরণ করতে হবে।
নতুন আচরণবিধিতে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতাও আরও জোরদার করা হয়েছে। কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করছেন বলে মনে হলে কমিশন তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারবে। গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া নির্ধারিত নির্বাচনী ব্যয়সীমা অতিক্রম, অর্থ বা পেশিশক্তির মাধ্যমে ভোটারদের প্রভাবিত করা এবং সরকারি সম্পদের অপব্যবহার করে প্রচারণা চালানোকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের নতুন এই বিধিমালার মূল লক্ষ্য হলো উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে আরও অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক করা এবং সব প্রার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে পোস্টার, মিছিল ও শোডাউন বন্ধ করা এবং অনলাইন প্রচারণায় AI-নির্ভর অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণের বিধান এবারের উপজেলা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।
স্বদেশ প্রতিদিন/আরএম