
বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে খাদ্য ও অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, “ক্ষুধা অভাবের কারণে নয়, এটি আমাদের তৈরি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল।”
সোমবার ইতালির রাজধানী রোমে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী গড়ার জন্য ছয়টি প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
অধ্যাপক ইউনূসের ছয় দফা প্রস্তাব
যুদ্ধ ও ক্ষুধার চক্র ভাঙা – সংঘাত বন্ধ করে সংলাপ শুরু করতে হবে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
এসডিজি ও জলবায়ু প্রতিশ্রুতি পূরণ – টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) বাস্তবায়নে অর্থায়নের অঙ্গীকার ও জলবায়ু অভিযোজন কর্মে আন্তরিক হতে হবে।
আঞ্চলিক খাদ্য ব্যাংক গঠন – সরবরাহ শৃঙ্খলকে স্থিতিশীল রাখতে ও সংকট মোকাবিলায় আঞ্চলিক খাদ্য মজুত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তরুণ ও নারী উদ্যোক্তা তৈরি – কৃষি, প্রযুক্তি ও স্থানীয় উৎপাদন খাতে তরুণ ও নারীদের জন্য অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়াতে হবে।
খাদ্য বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা বন্ধ – বৈশ্বিক বাণিজ্য যেন খাদ্য নিরাপত্তাকে বাধাগ্রস্ত না করে, সে জন্য রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা বন্ধ করতে হবে।
গ্লোবাল সাউথের প্রযুক্তি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা – উন্নয়নশীল দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সুযোগ উন্মুক্ত করতে হবে।
বক্তৃতায় তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও আমরা ১৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষকে খাদ্য জোগাই এবং মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকেও আশ্রয় দিয়েছি। আমরা ধান, সবজি ও মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি। কৃষকেরা জমির ব্যবহার ২১৪ শতাংশে উন্নীত করেছেন, পাশাপাশি ১৩৩টি জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন।”
বর্তমান মুনাফাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ‘অমানবিক ও অসম’ আখ্যা দিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “এই ব্যবস্থা কোটি কোটি মানুষকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। এখন সময় এসেছে নতুন ধরনের ব্যবসা গড়ার—যেখানে লক্ষ্য হবে মুনাফা নয়, সমস্যা সমাধান। এই ধারণাই সামাজিক ব্যবসা।”
তিনি তার প্রস্তাবিত ‘থ্রি জিরো ওয়ার্ল্ড’ ধারণার কথা উল্লেখ করে বলেন, এই বিশ্বের লক্ষ্য হলো—জিরো ওয়েলথ কনসেনট্রেশন, অর্থাৎ সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গঠন; জিরো আনএমপ্লয়মেন্ট, অর্থাৎ সবার জন্য উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি; এবং জিরো নেট কার্বন এমিশন, অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামানো। তিনি বলেন, “এটি কোনো কল্পনা নয়, পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে এটি এখন অপরিহার্য বাস্তবতা।”
“এটি কোনো কল্পনা নয়,” বলেন তিনি, “পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখতে এটি এখন অপরিহার্য বাস্তবতা।”
লিখিত বক্তব্যে অধ্যাপক ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ ডানোনের উদাহন দিয়ে বলেন, “গ্রামীণ ব্যাংক দেখিয়েছে—দরিদ্র নারীরাও সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন। গ্রামীণ ডানোন লড়ছে শিশুদের অপুষ্টির বিরুদ্ধে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব সামাজিক ব্যবসা মানুষ ও সমাজকে ক্ষমতায়িত করছে—এগুলো কেবল তত্ত্ব নয়, বাস্তব সাফল্যের গল্প।”
তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আজকের তরুণরা অতীতের চেয়ে অনেক বেশি সৃজনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর। তাদের হাতে এমন শক্তি রয়েছে যা মাত্র দুই দশক আগেও কল্পনা করা যেত না। তাই তাদের হাতেই ভবিষ্যতের পরিবর্তনের চাবিকাঠি।”
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ