
বাংলাদেশে প্রতি চারজন নারীর মধ্যে তিনজনই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে স্বামী বা জীবনসঙ্গীর হাতে সহিংসতার শিকার হয়েছেন— এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথভাবে পরিচালিত সাম্প্রতিক জরিপে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীরা সবচেয়ে বেশি যে সহিংসতার মুখোমুখি হন তা হলো শারীরিক, যৌন, মানসিক, অর্থনৈতিক নির্যাতন ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ।
সোমবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’-এর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
জরিপে জাতিসংঘের মানদণ্ড ছাড়াও বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় বিদ্যমান নানা প্রকার সহিংসতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়নের জন্যই এই জরিপটি পরিচালিত হয়েছে। পাশাপাশি, এতে জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা ও আইনি সহায়তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়।
জরিপে উঠে এসেছে, দেশের ৭৬ শতাংশ নারী জীবনের কোনো এক পর্যায়ে স্বামীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৬২ শতাংশ নারী কখনোই নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেননি।
নন-পার্টনার বা স্বামী ব্যতীত অন্য ব্যক্তির দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১৫ শতাংশ নারী। ১৫ বছর বয়স থেকে শুরু করে বিবেচনা করলে দেখা যায়, ২.২ শতাংশ নারী নন-পার্টনারের যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
তবে আশার খবর হলো, ২০১৫ সালের তুলনায় স্বামী কর্তৃক সহিংসতার হার কিছুটা কমেছে। ২০১৫ সালে এই হার ছিল ৬৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯ শতাংশে।
যদিও সহিংসতার শিকার নারীদের অনেকেই এখনও চিকিৎসা বা আইনি সহায়তা নিতে পারছেন না। সামাজিক ভয়, লজ্জা ও কুসংস্কারের কারণে তারা নীরব থাকছেন।
জরিপে আরও বলা হয়েছে—
• অর্ধেকেরও বেশি নারী (৫৪ শতাংশ) জীবদ্দশায় স্বামীর হাতে শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
• যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ৬০ শতাংশ গত এক বছরে একাধিকবার এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন।
• গর্ভাবস্থায় ৭.২ শতাংশ নারী শারীরিক এবং ৫.৩ শতাংশ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
• নন-পার্টনার সহিংসতায় শাশুড়ি ও পুরুষ আত্মীয়দের সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে, অধিকাংশ যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে পরিচিত পুরুষ— বন্ধু, আত্মীয় বা প্রতিবেশীদের মাধ্যমে।
• প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৮.৩ শতাংশ নারী; এর মধ্যে রয়েছে যৌন ব্ল্যাকমেইল, ছবি বা ভিডিওর অপব্যবহার এবং অনলাইন নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ।
সহায়তা গ্রহণের হারও উদ্বেগজনকভাবে কম। মাত্র ১৪.৫ শতাংশ নারী চিকিৎসা নিয়েছেন, আর আইনি সহায়তা নিয়েছেন ৭.৪ শতাংশ। বেশিরভাগ নারী স্থানীয় নেতাদের দ্বারস্থ হয়েছেন, আর নন-পার্টনার সহিংসতায় আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ৩.৮ শতাংশ আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।
জরিপে দেখা গেছে, দেশের মাত্র ৪৮.৫ শতাংশ নারী জানেন কোথায় সহিংসতার অভিযোগ জানাতে হয়, আর ১০৯ হেল্পলাইন সম্পর্কে জানেন মাত্র ১২.৩ শতাংশ নারী।
সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়— কম বয়সে বিয়ে, যৌতুক প্রথা, স্বামীর মাদকাসক্তি, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক এবং শহরের বস্তিতে বসবাস। অন্যদিকে, স্বামীর উচ্চশিক্ষা সহিংসতার ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে।
নন-পার্টনার সহিংসতার ক্ষেত্রে নারীর অল্প বয়স, কম শিক্ষা এবং প্রতিবন্ধিতা বড় ঝুঁকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে প্রতিবেদনে।
স্বদেশ প্রতিদিন/ আরএফ