
#বাংলাদেশ নিয়ে দেশে-বিদেশের ‘অপতৎপরতা’ ঠেকাতে দ্রুত নির্বাচন প্রয়োজন
# নির্বাচন ইস্যূতে হঠাৎ উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঙ্গণ
# দ্রুত ভোটের দাবিতে রাস্তায় নামার আহবান বিএনপির
# বিএনপির সুরেই কথা বলছে জামায়াত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইস্যূতে হঠাৎ উত্তপ্ত রাজনৈতিক অঙ্গণ। অন্তর্বর্র্তী অর্ন্তবর্তী সরকারের মেয়াদ প্রায় ৫ মাসে কাছাকাছি। এ সরকার আগামী জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ সালে করতে আগ্রহী। কিন্তু এতে নারাজ বিএনপি। ২০২৫ সালেই নির্বাচন চায় দলটি। এমনকী দ্রুত ভোটের দাবিতে রাস্তায় নামার আহবান জানিয়েছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০২৫ সালে নির্বাচন বিএনপির দাবির সাথে প্রথমে দ্বিমত পোষণ করে জামায়াত। কিন্তু পরদিন সূর পাল্টিয়ে বিএনপির সাথে একাত্বতা ঘোষণা করেছে দলটি। অপরদিকে, ২০২৫ সালেই আগামী নির্বাচনের দাবিটি জোড়দার করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করছে বিএনপি লিয়াজো কমিটি। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠকে রাজনৈতিক জোট দল ও সমমনা সংগঠনের শীর্ষনেতারা বিএনপির দাবির সাথে একমত পোষণ করেন বলে তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে।
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সুনিদিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা দেয়নি। তবে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া সর্বশেষ ভাষণে বলেছেন, ২০২৫ সালের শেষে বা ২০২৬ সালের শুরুতে আগামী জাতীয় নির্বাচন হতে পারে। এটিই ছিলো সরকার প্রধানের দিক থেকে নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সীমা সম্পর্কে প্রথম কোন আনুষ্ঠানিক মন্তব্য। কিন্তু, এর পরদিনই তার প্রেস সচিব এক সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬ সালের ৩০শে জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এর একদিন পরেই বিএনপি মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ও তার প্রেস সচিবের বক্তব্যকে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে উষ্মা প্রকাশ করেন। তখনি তিনি বলেছিলেন, নির্বাচন কেন্দ্রিক সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। জনগণ এই বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার কাছে সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশা করে। যদিও সরকার ইতোমধ্যেই নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে এবং কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শুরু করেছে।
গত ৮ আগষ্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠণের শুরু থেকেই দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন দাবি করে আসছে বিএনপি। নির্বাচনের আগে রোডম্যাপের দাবি করে দলটি। প্রধান উপদেষ্টার সাথে কয়েকদফা বৈঠক করে এই দাবি জানান বিএনপির সিনিয়র নেতারা। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দ্রুত নির্বাচনের রোডম্যাপ দাবি করে বিভিন্ন সভা সমাবেশে বক্তব্য দেন। তিনি তার বক্তব্যে দ্রুত নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। কিন্তু অর্ন্তবর্তী সরকারের ধীরগতি দেখে কঠোর হয় বিএনপি। তারা ২৫ সালে নির্বাচন করার দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুুতিও নিচ্ছে। ২০২৫ সালে নির্বাচনের বিএনপির দাবির সাথে বিরোধীতা করেছিল জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু জামায়াতের মনোভাবের পরিবর্তন হয়েছে। তারাও বিএনপির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। আর দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে থাকা মিত্র দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেছে বিএনপি। ১২ দলীয় জোট, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির সঙ্গে পৃথকভাবে রাজধানীর গুলশানে দলীয় চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এ বৈঠক করে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটি। এতে দেশের বর্তমান পরিস্থিতির পর্যালোচনা করে দ্রুত নির্বাচনের পক্ষে মত দেন মিত্র দলগুলোর শীর্ষ নেতারা। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সার্বিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যা যা করা দরকার তারা তা করবে বলেও মত দেন নেতারা।
বৈঠক সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় নির্বাচনের সময়সীমা প্রসঙ্গে জোট নেতাদের কাছে মতামত জানতে যায় বিএনপি। সেখানে এসব জোট ও দলের নেতারা অভিন্ন সুরে জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনোভাবেই ২০২৫ সাল অতিক্রম করতে পারে না। এ সময়ের মধ্যে নির্বাচন না হলে দেশে অস্থিরতা বাড়বে, পতিত ফ্যাসিবাদের দোসররা আরও শক্তি সঞ্চয় করে গভীর ষড়যন্ত্র করতে সক্ষম হবে। এতে দেশ ও জাতির বড় ক্ষতি হবে।
আরও জানা যায়, বৈঠকে নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ও তার প্রেস সচিবের বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী উল্লেখ করে এর সমালোচনা করেন নেতারা। তারা বলেন, সরকারের মধ্যেই কোনো সমন্বয় নেই। এতে শুধু রাজনৈতিক অঙ্গণে নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তাই সরকারের মধ্যে অবশ্যই সমন্বয় থাকা উচিত এবং নির্বাচন ইস্যুকে তাদের সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া উচিত। ধারাবাহিক বৈঠকের অংশ হিসেবে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজের সাথে লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক হয়। বৈঠক সূত্রে জানা যায়,আগামী জাতীয় নির্বাচনের সময়সীমার বিষয়ে জোট নেতাদের মতামত জানতে চায় বিএনপি। এ সময় মিত্র দলগুলোর নেতারা অভিন্ন সুরে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনোভাবেই ২০২৫ সাল অতিক্রম করতে পারে না। এ সময়ের মধ্যে নির্বাচন না হলে দেশে অস্থিরতা বাড়বে। ফ্যাসিবাদের দোসররা আরও শক্তি সঞ্চয় করে গভীর ষড়যন্ত্র করতে সক্ষম হবে। এতে দেশ ও জাতির বড় ক্ষতি হবে।
বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার থেকে নির্বাচনের যে সময়ের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এটা আমাদের কারও জানা ছিল না। এ নিয়ে কারও সঙ্গে আলোচনাও হয়নি। আমরা মনে করি, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আগামীর নির্বাচন। সে ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে যে কথা হচ্ছে, এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। সুতরাং আমরা অবগত নই, কি কারণে এত দীর্ঘ সময়ের কথা বলা হলো। এটা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। আমরা যে যৌক্তিক সময়ের কথা বলেছিলাম, সেই বিষয়টা আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
আমির খসরু বলেন, সংস্কারের বিষয়ে আমরা সবাই মিলে যে আলোচনা করেছি, তার প্রথম সংস্কার হওয়া দরকার। সেটা হচ্ছে- আগামীদিনে যে নির্বাচনটা হবে, সেই নির্বাচনের সংস্কারটা সবার আগে হওয়া উচিত ছিল। এর মধ্যে অন্যান্য সংস্কারের কথা উঠে এসেছে। কিন্তু সংস্কার মূলত হতে হবে সংসদে। সুতরাং কি সংস্কার নির্বাচনের আগে করতে পারেন, সেটা দেখা যাক। ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে সংস্কার প্রয়োজন আছে, সেটা এই কম সময়ের মধ্যে করতে হবে। আর যেখানে ঐকমত্য হবে না, সেগুলো নিয়ে আগামী নির্বাচনে জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণের সমর্থন নিয়ে আমাদের সেই কাজগুলো করতে হবে। সংস্কারের কথা বলে আপনি বিভিন্ন কমিটির রিপোর্ট দেবেন এবং আবার বসবেন। এ বিষয়গুলো দীর্ঘায়িত করার প্রয়োজনীয়তা নেই।
বৈঠকে নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদষ্টোর বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হয়। নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়ে বলা হয়, কেউ ৬ মাসের মধ্যে নির্বাচনের চায় না। কিন্তু নির্বাচনসংক্রান্ত সংস্কারগুলো করে অতি দ্রুত নির্বাচন দিতে হবে। অন্যথায় যে সমস্যা ও সংকট তৈরি হচ্ছে তা দূর হবে না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারই পারে এ সমস্যা ও সংকট দূর করতে। আর জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া নির্বাচনকে আরও প্রলম্বিত করবে।
এদিকে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোটাধিকার আদায়ে ৫ আগস্টের মতো রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। দেশের জন্য প্রয়োজনে আরেকটা লড়াই হবে। ভোটের অধিকার আদায়ে ৫ আগস্টের মতো আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাস্তায় নামতে হবে। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, এর পরেও নির্বাচন নিয়ে ‘রাস্তায় নামার আহবান’ আসার মূল কারণ হলো সরকার সংশ্লিষ্ট কিছু মহল থেকে নির্বাচন নিয়ে নানা ধরণের মন্তব্য আসা। বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাতীয় নাগরিক কমিটি থেকে নির্বাচনের চেয়ে সংস্কার কার্যক্রমে জোর দেওয়া এবং বিএনপির সমালোচনা করে করা নানা ধরনের মন্তব্য থেকে দলটির অনেকে আশঙ্কা করছেন যে, এগুলো নির্বাচনকে বিলম্বিত করার প্রেক্ষাপট তৈরির একটি প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছেন, সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না দিয়ে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য আসছে বলেই জনমনে বিভ্রান্তি কিংবা অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। মানুষ কখন ভোট দিয়ে তাদের পছন্দনীয় সরকার গঠন করতে পারবে সেটা স্পষ্ট করা দরকার দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে। সরকার অন্য যাই বলুক, এই ভোটের সময়টা না পাওয়াতেই জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিএনপি সেটিই তুলে ধরছে। তাছাড়া, তিনি মনে করেন দেশের নানা সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে দেশে-বিদেশে যেসব ‘অপতৎপরতা’ চলছে সেগুলোও সরকার সামাল দিতে পারছে না। নানা ধরনের প্রচারণা দেখছি আমরা বাংলাদেশকে নিয়ে। নির্বাচিত সরকার ছাড়া এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা কঠিন। অথচ সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে বিএনপি ও নির্বাচন নিয়ে নানা ধরণের মন্তব্য আসছে সরকার ও সরকার ঘনিষ্ঠ মহলগুলো থেকে। এজন্যই বিএনপি জনগণের ভোটের অধিকার চাইছে ও এ নিয়ে কথা বলছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমআর