
# কর্মীদের পোশাক, বাগান পরিষ্কারের নামে এবং খাতায় ভুয়া কর্মচারী দেখিয়ে বিল-ভাউচারে আত্মসাত করেন কোটি কোটি টাকা
২০১২ সালের এপ্রিল মাসে গণপূর্ত বিভাগের আরবরিকালচারের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ হিসেবে যোগদেন উপ-বিভাগীয় অফিসার শেখ মো. কুদরত-ই-খুদা। এরপর ক্ষমতার জোরে নিয়ম-নীতির (চাকুরি) ব্যত্যয় ঘটিয়ে টানা এক যুগেরও বেশি সময় বিভাগটির প্রধান থেকে ‘চেয়ার’ দখল করে রেখেছেন। আর জ্যৈষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে এগিয়ে থাকা আরেক উপ-বিভাগীয় অফিসার মো. মোয়াজ্জেম হোসেন এক্ষেত্রে হয়েছেন বৈষম্যের শিকার। গ্রামের বাড়ি বগুড়া হওয়ায় তিনি বঞ্চিত হন প্রধান বৃক্ষপালনবিদ পদায়িত থেকে। বারবার এক শাখা থেকে অন্য শাখায় বদলি করে তাকে মানসিক হয়রানি করা হয়। তবে শেখ মো. কুদরত-ই-খুদা আওয়ামী লীগের সমর্থক হওয়ার কারণে জুনিয়র হয়েও প্রধান বৃক্ষপালনবিদের পদটি ভাগিয়ে নেন। এসব তথ্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের সূত্র জানিয়েছেন।
এদিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় ‘প্রধান বৃক্ষপালনবিদ’ দায়িত্বে আসেন শেখ মো. কুদরত-ই-খুদা। তিনি আওয়ামী লীগ মাইন্ডের কর্মকর্তা হওয়ায় কর্মস্থলে দেখাতে থাকেন ক্ষমতার দাপট। টানা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আত্মসাত করেন কোটি কোটি টাকা। কর্মীদের পোশাক, বাগান পরিষ্কারের নামে এবং খাতায় ভুয়া কর্মচারী দেখিয়েও ভুয়া বিলে-ভাউচারে তুলে নেন টাকা। এ ছাড়া ঠিকাদারের সঙ্গে আঁতাত করে চারা রোপণ, সীমানাপ্রাচীর তৈরি, হেজবেড ও ফুলের বেড প্রস্তুতের বরাদ্দ গায়েব করে দেন বলে ওই সূত্র জানান। এতো অনিয়ম ও দুর্নীতি করেও স্ব-পদে বহাল তবিয়তে আছেন কুদরত-ই-খুদা।
জানতে চাইলে আরবরিকালচার-এর উপ-বিভাগীয় অফিসার মো. মোয়াজ্জেম হোসেন স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের শাখায় (আরবরিকালচার) বছরে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে। এ বরাদ্দের বড় একটি অংশ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে লুটপাট করছেন প্রধান বৃক্ষপালনবিদ কুদরত। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত টাকা-পয়সা খরচ করে ধামাচাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। তার দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় আমাকেসহ অন্যদের নানাভাবে হয়রানি করছেন।
অভিযোগ উঠেছে আরবরিকালচারের ওই প্রধান কর্মকর্তা আর অফিস করতে কার্যালয়ে আসছেন না। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এর ফলে কার্যালয়টির সব কাজ স্থবির হয়ে গেছে। অভিযোগের সূত্র ধরে গত ২২ সেপ্টেম্বর ওই কার্যালয়ে সড়েজমিন পর্যবেক্ষণে যাওয়া হয়। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কুদরত-ই-খুদাকে অফিস রুমে আসতে দেখা যায়নি। পরে অফিস রুমে গিয়ে টেবিলের ওপর দেখা গেছে বিভিন্ন নথিপত্র ছিটিয়ে-ছড়িয়ে আছে। এ বিষয়ে কয়েকজন কর্মচারী জানান, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই তিনি (কুদরত) পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আর অফিসে আসেন না। বিভিন্ন কাজের লোকজন এসে ঘুরে যাচ্ছেন। তার পরিবর্তে অন্য কোনো কর্মকর্তাকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এরফলে অফিসটির সব কাজ স্থবির হয়ে গেছে।
জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গণপূর্তের বৃক্ষপালন শাখার ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে তদন্তকাজ শুরু করে। দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বরাবর এ চিঠি ইস্যু করা হয়। ওই সময় দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা গণপূর্তের বৃক্ষপালন শাখার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা দুদকের কাছে প্রধান বৃক্ষপালনবিদের দুর্নীতির বিষয়ে তথ্য দেন। পরে দুদক একজন কর্মকর্তা ও দুজন কর্মচারীকে চিঠি দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। এরপর দুদক গণপূর্তের ওই শাখার বেশ কিছু ফাইল তলব করে। কিন্তু কুদরত-ই-খুদা দুদককে সেই সব ফাইল জমা দেননি। পরে দুদক গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে চিঠির মাধ্যমে ওই সব অভিযোগের তদন্ত করে দেখার সুপারিশ করে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ভিত্তিতে গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির কাছেও ওই সব ফাইলের তথ্য দেয়া হয়নি।
অপরদিকে, ২০১৬ সালে কুদরত-ই-খুদার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তকাজ চলমান সময় তার দুর্নীতির বিষয়ে মুখ খোলেন মো. মোয়াজ্জেম হোসেন নামের কর্মকর্তা ও কয়েক জন কর্মচারী। তবে, এ ঘটনায় কুদরত-ই-খুদা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দুর্নীতির প্রতিবাদকারী একজনকে চাকরিচ্যুত করেন। আর বাকিদের শাস্তিমূলক বদলি করেন। মোটা অঙ্কেও টাকা বিনিময় করে ৭ বছর ধরে চেপে রেখেছেন সেই দুর্নীতির তদন্ত।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, প্রধান বৃক্ষপালনবিদ শেখ মো. কুদরত-ই-খুদাকে ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি ওই সব কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছিল। দুদকের চাহিদার বিষয়ের মধ্যে ছিল ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ভুয়া পোশাক ভাতা বিলের মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা উত্তোলন, কাজ না করে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নতা খাতের ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৩৯৯ টাকা আত্মসাৎ, সীমানাপ্রাচীর ও বহিঃবিভাগে হেজবেড এবং ফুলের বেড প্রস্তুত, চারা রোপণসহ বিভিন্ন খাতের ১৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭২ টাকার কাজ না করে বিল উত্তোলন, ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘাস কর্তন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নার্সারির উন্নয়ন কার্যক্রম এবং শিখা চিরন্তন এলাকায় ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণের হিসাব, বাংলাদেশ সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবন, ২ নম্বর ভবন, ৩ নম্বর ভবন, ৪ নম্বর ভবন, ৮ নম্বর ভবন, ৯ নম্বর ভবনসংলগ্ন মাঠে গ্রীষ্ম ও শীতকালীন মৌসুমি ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণের তথ্য-উপাত্ত, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের আরবরিকালচার (বৃক্ষপালন শাখার) কর্মীদের পোশাকের নথি এবং বাংলাদেশ সচিবালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর দিকের সীমানাপ্রাচীরের বহিঃবিভাগ হেজবেড প্রস্তুত ও চারা রোপণ এবং শাখাতে চারা কলম উৎপাদনের হিসাব, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটের ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন প্রাঙ্গণে গ্রীষ্ম ও শীতকালীন মৌসুমের ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণ এবং পূর্ত ভবন প্রাঙ্গণের ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণ ও শোভাবর্ধন গাছ সরবরাহকরণ এবং ইস্কাটন গার্ডেনে উচ্চপদস্থ সরকারি বাড়ির আঙিনায় শীতকালীন মৌসুমি ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণের খরচের হিসাব।
এ প্রসঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার বলেন, আমার জানা মতে বেশকিছু দুর্নীতির অভিযোগ ছিল প্রধান বৃক্ষপালনবিদের বিরুদ্ধে। তবে, সে-সবের সর্বশেষ কী অবস্থা, সেটি আমি যাচাই-বাছাই করে দেখব। দুর্নীতির ঘটনার পরো যদি তদন্তকাজে কোনো বিচ্যুতি থেকে থাকে, তাহলে-তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে বক্তব্যে নিতে আরবরিকালচারের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ শেখ মো. কুদরত-ই-খুদার মোবাইলে দুটি ব্যবহৃত নম্বরে একাধিকবার সংযোগ করা হলেও, সংযোগ মেলেনি। পরে, প্রতিবেদক পরিচয় নিশ্চিত করে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও, প্রতিত্তোর পাওয়া যায়নি।
স্বদেশ প্রতিদিন/এমআর