
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগ থেকে চাকরি ছেড়ে আবার সেই বিভাগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছিলেন অধ্যাপক ড. এএফএম আবদুল মঈন। কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) উপাচার্য হিসেবে নিয়োগের আগে তার ফাইলে উল্লেখ ছিলো তিনি ওই বিভাগেরই নিয়মিত অধ্যাপক। ফলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সেই তথ্য গোপন করেই তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম উপাচার্য হিসেবে ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি নিয়োগ পেয়েছিলেন। এদিকে ২০১১ সালে চাকরি ছাড়লেও তিনি ঢাবিতে নিয়মিত শিক্ষক উল্লেখ করায় তাকে দুবার ইনক্রিমেন্ট দিয়েছে কুবির অর্থ দপ্তর। তিনি সেটি গ্রহণও করেছেন।
জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক থাকাকালীন তিনি যে টাকা বেতন পেতেন তার থেকে বর্তমানে প্রতিমাসে ২৬ হাজার নয়শ’ টাকা ইনক্রিমেন্ট নিচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড এ এফ এম আবদুল মঈন গতকাল দাবি করেছেন, অনৈতিকভাবে তিনি ইনক্রিমেন্ট নিচ্ছেন না। নিয়ম অনুযায়ীই ইনক্রিমেন্ট নেওয়া হচ্ছে। পরে তিনি এই প্রতিবেদককে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘তুমি (সাংবাদিক) লিখলেই অনৈতিক হয়ে গেলো? আমি ইনক্রিমেন্ট নিয়ে থাকলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সেটি দেখবে, ইউজিসি দেখবে। তুমি (সাংবাদিক) দেখার কে?’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির অফিস স্মারক অনুযায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি এবং অন্যদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ক্ষেত্রে অবসর গ্রহণের আগ মুহূর্তে পাওয়া শেষ বেতন চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত পদের বেতন হিসেবে নির্ধারিত হবে। বিশেষ ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত অথবা উভয় পক্ষের সম্মতিতে সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত বেতনই চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত পদের বেতন হিসেবে নির্ধারিত হবে। তবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকালীন চাকরির জন্য কোনো বর্ধিত পেনশন বা ইনক্রিমেন্ট পাবেন না।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুবি উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মঈন ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক থাকাকালীন চাকরি ছেড়ে দেন। তখন তিনি গ্রেড-৩ এর অধ্যাপক ছিলেন। চাকরি ছেড়ে ২০২০ সাল পর্যন্ত তিনি অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষকতা করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাবির একই বিভাগে চুক্তিভিত্তিক অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। তাকে কুবি উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি হলে ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) তার সঙ্গে ওই চুক্তি বাতিল করে।
জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী, তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা হিসেবে ৬৮ হাজার ৭৭০ টাকা বেতন পেয়ে আসছিলেন অধ্যাপক আবদুল মঈন। পরবর্তী সময়ে কুবি থেকে দুবার ইনক্রিমেন্ট নিয়ে বর্তমানে তিনি ৭৪ হাজার ৪০০ টাকা করে পাচ্ছেন। তবে তিনি ঢাবির সঙ্গে চুক্তিতে থাকাকালীন আরো কম বেতন পেতেন বলে জানা গেছে।
‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তথ্য গোপন করে অধ্যাপক আবদুল মঈন উপাচার্য হয়েছেন এবং অনৈতিকভাবে ইনক্রিমেন্ট গ্রহণ করেছেন। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকেই তিনি (অধ্যাপক মঈন) বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট গ্রহণ করছেন। নিয়ম অনুযায়ী তিনি সেটি নিতে পারেন না। এটি অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি এবং বেআইনি কাজ।’
আবু তাহের আরো বলেন, ‘অবসর বা চুক্তিতে নিয়োজিত থাকা ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রজ্ঞাপন ভিন্ন হয়। কিন্তু অধ্যাপক মঈন উপাচার্য হওয়ার সময় চুক্তিতে থাকার তথ্য গোপন করেন। ভুল তথ্য দিয়ে উপাচার্য পদে থাকার নৈতিক অধিকার তার নেই।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা বলছেন, অধ্যাপক মঈন ভুল তথ্য দিয়ে উপাচার্য হয়েছেন। তিনি গবেষণা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুষদে ভুয়া বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ করছেন। সেজন্য তার বিরুদ্ধে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামানের কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৭০ জনের মতো শিক্ষক আছে। কার কখন ইনক্রিমেন্ট হয় এটা কি কোষাধ্যক্ষ বসে বসে গুনবে? অর্থ দপ্তরে যিনি বেতন দেখেন (আবু তাহের), তিনি হয়তো ভুল করছেন।’
এ বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরের ডেপুটি ডিরেক্টর মো. আবু তাহের বলেন, ‘তার (অধ্যাপক মঈন) নিয়োগপত্রে কোথাও লেখা নেই যে, তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। সে কারণে আমরা ধরেই নিয়েছি তিনি নিয়মিত শিক্ষক। সে হিসেবে ইনক্রিমেন্ট দেওয়া হয়েছে। এখানে আমাদের কোনো ভুল নেই। আমরা শুধু আদেশ পালন করি, যাচাই-বাছাই করার দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের।’
দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক কামাল উদ্দীন ভূঁইয়া বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেভাবে কাগজ দেওয়া হয়েছে সেভাবেই বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। তার (উপাচার্য) নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে কোথাও লেখা নেই যে, তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত।’ তবে তথ্য গোপনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ হিসাব দপ্তরের পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অবসরপ্রাপ্ত কারও বেতন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে ঠিক করেছে, সেটা ওনারা জানতে পারবে। তবে আইন অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত কেউ ইনক্রিমেন্ট নিতে পারে না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মোশারফ হোসাইন বলেন, ‘কুবির ভিসি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক না। ২০১১ সালের দিকে অবসরে চলে যান এবং করোনা মহামারীর সময় সরকার উনাকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছিলো।’
/এম/