
সরকারি চাকরির স্বপ্ন নিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছিলেন ফাতেমাতুজ্জোহরা জেমি (৩১)। উচ্চশিক্ষিত হয়ে সোনার হরিণ নামের চাকরি পেতে বিভিন্ন স্থানে ছুটাছুটি করতে থাকেন তিনি। একসময় চাকরির পেছনে ছুটতে গিয়ে হাঁপিয়ে পড়েন ফাতেমাতুজ্জোহরা জেমি। তবুও তাঁর ভাগ্যে জোটেনি কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরি। পরিশেষে চাকরি পাওয়ার স্বপ্নে গুঁড়ে বালি হলে বেকারত্বের হতাশার অথৈ জলে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন তিনি।
জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ সংগ্রামী এই নারী গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের বাসিন্দা। তাঁর স্বামী হাসানুল হুদা রাশেদ। জেমি এসএসসি পাস করেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামীর আর্থিক সংকটের মুহূর্তে সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে সরকারি চাকরির প্রত্যাশায় লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করেন তিনি। লেখাপড়ায় উচ্চশিক্ষায় সফলতা অর্জন করলেও ভাগ্যে আর জোটেনি চাকরি। তবে চাকরি না হলেও মনোবল হারাননি তিনি।
অবশেষে ভাগ্যবদলের জন্য নিজেকে আত্মনির্ভরশীল করতে ধৈর্য, শ্রম, সহনশীলতা ও চেষ্টায় হয়ে ওঠেন একজন দক্ষ উদ্যোক্তা।
সংকটময় সংসারজীবনে সরকারি চাকরিকে পেছনে ফেলে নিজের প্রচেষ্টায় ‘পুরানলক্ষীপুরে গড়ে তুলছেন এমব্রয়ডারি পল্লি’। ফাতেমাতুজ্জোহরা জেমি নিজে উদ্যোক্তা হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র অনেকটা বদলে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে তাঁর হাত ধরে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন প্রায় শতাধিক নারী কর্মী। তবে জেমির এই সফলতার গল্পটা সহজ ছিল না। জেমি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে অনেক চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত চাকরি না হওয়ায় নিজেই একটা কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথমে মা-বাবা, শাশুড়ি, ননদ, জা-সহ আত্মীয়স্বজনদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে তিনি এ কাজে সফলতার মুখ দেখতে থাকেন। এরই মধ্যে তিন বছর আগে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) সাদুল্লাপুর উপজেলা কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. সালাউদ্দিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সেই সুবাদে ওই কর্মকর্তার পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন গাইবান্ধা সমন্বিত পল্লী দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্পের এমব্রয়ডারি ট্রেডে প্রশিক্ষণ নেন জেমি। সেই প্রশিক্ষণে ব্লক-বাটিকের প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁর জীবনের পথচলা শুরু হয়। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার কিছুদিন পরে বিআরডিবি থেকে ২০ হাজার টাকার ঋণ নেন তিনি। সামান্য সেই পুঁজি দিয়ে ছোট পরিসরে ১০ জন নারী কর্মী নিয়ে শুরু করেন বিভিন্ন ডিজাইনের নকশিকাঁথা, জামা, শাড়ি ও ওড়না তৈরির কাজ। পরে তাঁর তৈরি পণ্যের গুণগত মান ভালো হওয়ায় স্থানীয়ভাবে চাহিদা বেড়ে যায় এবং আর্থিকভাবে তিনি অনেকটা লাভবান হন। এভাবে ক্রমান্বয়ে তাঁর কাজের পরিধি বৃদ্ধি পেলে পুরানলক্ষীপুরে এমব্রয়ডারি পল্লি নামের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। বর্তমানে শতাধিক নারী কর্মী এ কাজে নিয়োজিত থেকে দৈনন্দিন উপার্জন করছেন।
জেমির সেই প্রতিষ্ঠানে সুঁই-সুতা আর নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের নকশিকাঁথা, রুচিসম্মত আকর্ষণীয় থ্রি-পিস, শাড়ি, বেডশিট, বালিশের কভার, টেবিল ম্যাট, পাপোশসহ নানা ধরনের কারুশিল্প পণ্য।
এরপর উদ্যোক্তা জেমি আবারও এসএমই থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে নতুন ব্র্যান্ডিং করার পরিকল্পনা নিয়ে গড়ে তোলেন ‘রায়তা পল্লী ক্রাফট’ নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠান। নিয়োজিত কর্মীরা যত্নের সঙ্গে সুঁই-সুতার কারুকাজ করে কাপড়ের ওপরে নানা রঙের দৃশ্যায়ন, ফুল, পাতা ও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী নকশা ফুটিয়ে তুলছেন। জেমি জানান, এ কাজে নিয়োজিত নারী কর্মীরা সাংসারিক কাজকর্মের পাশাপাশি বাড়তি উপার্জনের সুযোগ পেয়েছেন।
উদ্যোক্তা জেমি আরও বলেন, কর্মীদের পারিশ্রমিক যথাসময়ে পরিশোধ করেও প্রতিমাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হয়।
সিরিনা বেগম নামের একজন নারী কর্মী বলেন, “সংসারের দৈনন্দিন কাজকর্ম করে দিনের বেশির ভাগ সময় কোনো কাজ না থাকায় অলস সময় পার করতাম। এখন জেমি আপার এখানে কাজ শেখার পর সুঁই-সুতার কাজ করে প্রতিমাসে নিজের হাতে কিছু টাকা উপার্জন করতে পারছি। সন্তানদের ছোটখাটো আবদার মেটানো বা সংসারের টুকিটাকি চাহিদা পূরণ করা যায়।”
আরেক কর্মী সাথী খাতুন বলেন, “গ্রামে মেয়েদের জন্য কাজ পাওয়ার সুযোগ খুব কম। জেমি আপা আমাদের ডেকে এনে কাজ শিখিয়েছেন, আয়ের পথ দেখিয়েছেন। এখন আমরা শুধু নিজেরা স্বাবলম্বী নই, সংসারের অর্থনৈতিক গতি ফেরাতেও অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছি। জেমি আপার প্রচেষ্টায় আমরা অনেকেই আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারছি।”
উদ্যোক্তা জেমি জানান, স্বীয় আত্মবিশ্বাস নিয়ে গড়ে তোলা এই উদ্যোগ আজ কেবল তাঁকেই স্বাবলম্বী করেনি। তাঁর পাশাপাশি অনেক অসহায় নারীকে কাজের সুযোগ তৈরি করে দিতে পেরে নিজেকে খুব গর্বিত মনে হচ্ছে। এই কাজের সুবাদে কর্মরত এসব নারী উপার্জনের সুযোগ পেয়ে তাঁরাও বেশ খুশি।
উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. সালাউদ্দিন বলেন, “অদম্য ইচ্ছাশক্তিই জেমি প্রমাণ করেছেন, মানুষের কাছে কোনো কাজই অসম্ভব নয়। শুধু মেধা, শ্রম ও ধৈর্যের প্রয়োজন। এতে যেকোনো কাজে সফলতা অর্জন করা সম্ভব। আমাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে তিনি আজ গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদারে বড় ভূমিকা রাখছে। আমরা তাঁর এই ‘পুরানলক্ষীপুর এমব্রয়ডারি পল্লি’-কে আরও এগিয়ে নিতে সহজ শর্তে বড় অঙ্কের অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “জেমিকে আরও বড় পরিসরে সহজ শর্তে ঋণ ও সরকারি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদানের চেষ্টা করা হবে। তাঁর এই উদ্যোগ অন্যান্য স্থানেও ছড়িয়ে পড়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্র্যান্ডিং হয়ে উঠবে, এটাই প্রত্যাশা।”
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ