
কক্সবাজারে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। চলতি বছরের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ১৬৬ জনের। রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে দেখা দিয়েছে শয্যাসংকট। ২০ শয্যার ডেঙ্গু ইউনিটে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকায় অনেককে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীর সংকট এবং প্রয়োজনীয় সেবা পেতে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তির অভিযোগ।
হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগস্টে জেলা সদর হাসপাতালে ২০৪ জন এবং সেপ্টেম্বরে ৩২৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। অক্টোবরের প্রথম নয় দিনেও রোগীর চাপ বেশি ছিল। গত দুই মাসে জেলা সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ১১ অক্টোবরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৫ হাজার ১৬৬ জনের। তাঁদের মধ্যে রোহিঙ্গা শিবিরে আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৮৫ জন। সেখানে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১০ জন। মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন বয়স্ক নারী ও পুরুষ এবং ছয়জন শিশু।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে ৬১ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে উখিয়ায় ছয়জন, মহেশখালীতে নয়জন, রামুতে ছয়জন, চকরিয়ায় পাঁচজন, পেকুয়ায় দুজন এবং কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ৩৩ জন ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১১ জন।
শয্যার চেয়ে রোগী বেশি
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডের ডেঙ্গু ব্লকে রয়েছে মাত্র ১০টি শয্যা। বিপরীতে সেখানে ভর্তি আছেন ২৪ জন রোগী। শয্যা না পেয়ে অনেককে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। নারী ও শিশু মেডিসিনের ডেঙ্গু ব্লকেও একই ধরনের সংকট দেখা গেছে।
রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ, শয্যা না পাওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মশারি ও অন্যান্য সেবা পেতেও তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগী ঝিলাংজার মইনুল হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালে এসে এখনো কোনো সিট পাইনি। গতকাল থেকে হাসপাতালে ভর্তি আছি। শয্যা না পাওয়ায় খুব সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বর্তমানে অন্য একজন রোগীর সিটে বসেই থাকতে হচ্ছে।’
আরেক রোগীর স্ত্রী হোসনে আরা বলেন, ‘আমার স্বামী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু এখনো কোনো সিট নেই। মেঝেতেই শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। একজনের সিটে দুজনকে থাকতে হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য মশারি দেওয়া হলেও আমাদের মশারি দেওয়া হয়নি।’
ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশুর বাবা ফজল করিমের অভিযোগ, প্রয়োজনের সময় নার্সদের পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘একটি প্রয়োজনের জন্য নার্সকে ডাকতে তিন-চারবার যেতে হয়। বারবার অনুরোধ করলেও অনেক সময় সাড়া পাওয়া যায় না। এতে আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’
রোগীর চাপ বাড়লেও বাড়েনি জনবল
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৪০-এর নিচে। জুলাই থেকে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। তবে রোগীর চাপ বাড়লেও সে অনুযায়ী চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীর সংখ্যা বাড়েনি।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স মেরিনা হেমরক বলেন, ‘আগের তুলনায় বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী আমাদের ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য সাপোর্ট স্টাফের সংখ্যা বাড়েনি। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় আমরা জনবল সংকটে রয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো গেলে রোগীদের সেবা দেওয়া সহজ হবে এবং চিকিৎসাসেবার মানও উন্নত করা সম্ভব হবে।
জটিল রোগীদের বিশেষ নজরদারি
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের ডেঙ্গু ইউনিটের মুখপাত্র ডা. ইয়াছিন আরাফাত বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেশি থাকায় চিকিৎসকদের সংকটের মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে। তবে রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য আলাদা কর্নার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, জটিল অবস্থায় থাকা রোগীদের শনাক্ত করে সকাল-বিকেল, এমনকি প্রয়োজন অনুযায়ী ঘণ্টায় ঘণ্টায় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের প্রতি বিশেষ নজর রাখা হয়।
ডা. ইয়াছিন আরাফাত বলেন, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি দেখা যায়। গত সেপ্টেম্বরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে প্রায় ২০০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। আগস্টে ভর্তি ছিলেন ১৬৮ জন। চলতি অক্টোবরেও রোগীর চাপ বেশি রয়েছে।
মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পরামর্শ
ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। ডাবের খোসা, বালতি, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব, ছাদ কিংবা আঙিনায় জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই এসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ডা. ইয়াছিন আরাফাত বলেন, দিনের বেলায় মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত থাকতে ফুলহাতা জামা ও ফুলপ্যান্ট পরার অভ্যাস করতে হবে। যেসব এলাকায় মশার উপদ্রব বেশি, সেখানে দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার করা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকেও মশারির ভেতরে রাখতে হবে। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো মশা কামড়ানোর পর সেই মশার মাধ্যমে অন্যরাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে একদিকে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে, অন্যদিকে আক্রান্ত রোগীকেও মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত বছর কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ১ হাজার ২১০ জন। তাঁদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছিল। চলতি বছর জেলায় শনাক্তের সংখ্যা এরই মধ্যে পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। রোগীর চাপ সামাল দিতে শয্যা ও জনবল বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি