
১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এতে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৬-১৭ সেশনের শিক্ষার্থী হাসান মাহমুদ। ১৭তম বিজেএসে প্রিলিমিনারিতে ব্যর্থ হয়ে ভুলগুলো শুধরে নিয়ে ১৮তম বিজেএসে সিভিল জজ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি।
১৮তম বিজেএস পরীক্ষায় সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। ফলাফল পাওয়ার মুহূর্তের অনুভূতি কেমন ছিল—প্রশ্নে তিনি স্বদেশ প্রতিদিনকে জানান,
“আলহামদুলিল্লাহ, সিভিল জজ হওয়ার চাইতেও বড় কথা হচ্ছে আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আমার একাডেমিক লাইফ, পড়াশোনার লাইফ শেষ—এটাই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুভূতি।
যখন জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের ওয়েবসাইটে নিজের রোল নম্বরটা খুঁজে পাই, আমার দুচোখ দিয়ে শুধু পানি ঝরেছিল। আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গেই সিজদায় পড়ে গিয়েছিলাম। তখন আমার মা-বাবা কেউই কাছে ছিলেন না, কারণ আমি ঢাকায় ছিলাম। তারা পাশে থাকলে হয়তো অনেক শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলতাম—‘তোমার ছেলে জজ হয়েছে, তোমার ডাক আল্লাহ কবুল করেছেন।’”
আপনার পরিবার ও শিক্ষাজীবনের পেছনের গল্পটি শুনতে চাই— প্রশ্নে তিনি স্বদেশ প্রতিদিনকে জানান,
“আমার গ্রামের বাড়ি নীলফামারী জেলার ডোমার থানার বোড়াগাড়ী ইউনিয়নে। আমার বাবার নাম দেলোয়ার হোসেন।
ছোটবেলা থেকেই আমি পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো মানের ছাত্র ছিলাম। পঞ্চম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় আমি থানায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করি এবং এসএসসিতে জিপিএ-৫.০০ পাই। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও বিভিন্ন সেমিস্টারে ফার্স্ট বা সেকেন্ড হতাম। গ্র্যাজুয়েশন শেষে প্রথমে ৪৪তম বিসিএসের রিটেন পরীক্ষা দিই এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে দুইবার ভাইভা দিয়েছি।”
আপনি ১৭তম বিজেএসে ভাইভায় পৌঁছাতে পারেননি। প্রথমবারের সেই ব্যর্থতা থেকে কী শিক্ষা নিয়েছিলেন? প্রশ্নে তিনি স্বদেশ প্রতিদিনকে জানান,
“১৭তম জুডিশিয়ারিতে আমি প্রথমবার অ্যাপিয়ার করি এবং ভুল কিছু কৌশলের কারণে ভাইভায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হই। ব্যর্থ হওয়ার পর আমি নিজেই নিজের ৪টি প্রধান ভুল আইডেন্টিফাই করি। সেগুলো হলো—রিটেনে অপশনাল-২ সাবজেক্ট চুজ করা, জেনারেল পার্ট বাদ দিয়ে শুধু আইনে বেশি জোর দেওয়া, পরীক্ষার খাতায় ডাটা, চার্ট ও রেফারেন্স কেস কম দেওয়া, বিগত বছরের প্রশ্ন সম্পর্কে সম্যক ধারণার অভাব রাখা।
প্রথমবারের ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে এই ভুলগুলো শুধরে নতুন উদ্যমে ১৮তম বিজেএসের প্রস্তুতি শুরু করি এবং আলহামদুলিল্লাহ এবার সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছি।”
আপনার এই জুডিশিয়ারি ক্র্যাক করার মূল মন্ত্র কী ছিল? প্রশ্নে তিনি স্বদেশ প্রতিদিনকে জানান,
“আমার মূল মন্ত্র ছিল আগেরবারের ভুলগুলো শুধরে নেওয়া। ১৭তমতে অপশনাল-২ দেওয়াটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল, তাই ১৮তমতে অপশনাল-১ নির্বাচন করি। এছাড়া মনে রাখতে হবে—আইনে গ্র্যাজুয়েশন করা সবাই কম-বেশি সমান দক্ষতা রাখে। কিন্তু আপনাকে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে বিজেএস সিলেবাসের ‘জেনারেল পার্ট’। যারা জেনারেল বিষয়ে ভালো করবে, তারাই জুডিশিয়ারিতে এগিয়ে যাবে।”
যারা এখনো আইন বিভাগে পড়াশোনা করছেন, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার কী বার্তা বা পরামর্শ থাকবে? প্রশ্নে তিনি জানান,
“যারা রানিং শিক্ষার্থী, তাদের উদ্দেশ্যে বলব—অনার্স শেষে আলু সেদ্ধ আর ভাত খেয়ে ১ বছর কাটাতে যে টাকা লাগে, অন্তত সেই টাকা ক্যাম্পাস লাইফে থাকাকালীন সঞ্চয় করে রাখুন। কারণ অনার্স শেষে পার্টটাইম জব বা টিউশন সামলে জুডিশিয়ারি ক্র্যাক করা খুবই দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এই সময়ে ফ্যামিলি সচ্ছল থাকলেও আগের মতো আর সাপোর্ট থাকে না। তাই টিউশনের টাকা বাঁচিয়ে ব্যক্তিগত সঞ্চয় রাখুন, যেন গ্র্যাজুয়েশনের পর একটা বছর দরজা-জানালা বন্ধ করে নিশ্চিন্তে পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে পারেন।
পাশাপাশি সুযোগ থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় পড়া অবস্থায় ছোটদের গণিত, বিজ্ঞান, বাংলা ও ইংরেজি টিউশন করাবেন। কারণ এতে জেনারেল পার্টের বেসিক স্ট্রং হয়, যা বিজেএসে সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়।”
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ