
পটুয়াখালীর বাউফলে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কাছে অন্তত ১০ কোটি টাকা আটকে থাকার অভিযোগ উঠেছে। এতে বিপাকে পড়েছেন উপজেলার প্রায় পাঁচ হাজার গ্রাহক। বীমার নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিন থেকে পাঁচ বছর ধরে টাকা ফেরত পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন অনেকে। এর মধ্যেও কেউ কেউ ঝুঁকি জেনেও নিয়মিত কিস্তি জমা দিচ্ছেন।
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের বাউফল শাখা সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে কোম্পানিটির কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকে উপজেলায় গ্রাহকসংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে। তবে কোম্পানিটির প্রধান কার্যালয়ের সাবেক কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং আর্থিক সংকটের কারণে বাউফলের প্রায় পাঁচ হাজার গ্রাহকের ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা আটকে পড়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
কোম্পানিটির কার্যক্রম ডেস্ক ও ডেভেলপমেন্ট, এই দুই ভাগে পরিচালিত হয়। ডেস্ক বিভাগে কোম্পানির সরাসরি নিয়োগ করা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করেন। অন্যদিকে, ডেভেলপমেন্ট বিভাগে স্থানীয়ভাবে নিয়োজিত মাঠপর্যায়ের কর্মীরা গ্রাহক সংগ্রহ করেন। গ্রাহকদের অভিযোগ, এসব মাঠকর্মীর অনেকে অফিসে অবস্থান করে কর্মকর্তা পরিচয়ে বীমা করাতেন। অথচ টাকা ফেরত না পাওয়ার পরিস্থিতিতে এখন তাঁদের দায়ী করা হচ্ছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, মেয়াদ শেষে দ্বিগুণ টাকা, বার্ষিক বোনাস, প্রতি তিন বছর পর অতিরিক্ত বোনাস এবং মৃত্যুজনিত ঝুঁকিতে পুরো অর্থ পাওয়ার মতো নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের বীমা করানো হয়েছিল। এসব প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখে বীমা করলেও এখন নিজেদের জমানো টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তাঁরা।
সম্প্রতি বাউফল শাখা কার্যালয়ে গিয়ে একজন কর্মকর্তাকে ছাড়া অন্য কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পাওয়া যায়নি। অফিস-সহকারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা অন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকেও দেখা যায়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আবদুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
কার্যালয়ে থাকা সিনিয়র অফিসার মো. আব্বাস উদ্দিন বলেন, ‘২০১৯ সাল থেকে কোম্পানির টাকা দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। পর্যায়ক্রমে সব গ্রাহকের টাকা পরিশোধ করা হবে বলে প্রধান কার্যালয় থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। আমরাও স্থানীয় গ্রাহকদের সেই প্রতিশ্রুতিই দিচ্ছি। তবে কবে টাকা দেওয়া হবে বা কার্যক্রম কবে স্বাভাবিক হবে, তা জানাতে পারছি না।’
উপজেলার দাসপাড়া ইউনিয়নের গ্রাহক মো. সেলিম হোসেন বলেন, ‘২০১৩ সালে ১০ বছর মেয়াদি ১০ হাজার ৫০০ টাকার একটি বীমা করি। সাত বছর টাকা জমা দেওয়ার পর জানতে পারি, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স দেউলিয়া হওয়ার পথে। এরপর টাকা জমা দেওয়া বন্ধ করে দিই। আজ অফিসে এসে জানতে পারি, আমার হিসাবে মাত্র ৩০ হাজার টাকা রয়েছে। ১০ বছর পর দ্বিগুণ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। অথচ এখন আমার মূল টাকাই ফেরত পাচ্ছি না।’
মনিরা নাসরিন নামে আরেক গ্রাহকের দুটি বীমা চলমান। তিনি প্রতি মাসে দুটি বীমায় মোট ছয় হাজার টাকা জমা দেন। ঝুঁকি সম্পর্কে জানার পরও কিস্তি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
মনিরা নাসরিন বলেন, ‘শুরু থেকেই বীমা দুটি চালিয়ে আসছি। ২০২৭ সালে মেয়াদ শেষ হবে। আর কয়েক মাসের জন্য টাকা জমা দেওয়া বন্ধ করলে সব বোনাস হারাতে হবে, এই ভয়ে এখনো কিস্তি দিচ্ছি।’
মারজিয়া বেগম নামে আরেক গ্রাহক জানান, ২০১৬ সালের ২৪ জানুয়ারি তাঁর ১০ বছর মেয়াদি বীমা শুরু হয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। বীমা করার সময় মেয়াদ শেষে দ্বিগুণ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন তিনি জানতে পেরেছেন, ১০ বছরে মাত্র ১২ হাজার টাকা মুনাফা ধরা হয়েছে।
মারজিয়া বেগম বলেন, ‘মেয়াদ শেষে দ্বিগুণ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। এখন মুনাফা হিসেবে মাত্র ১২ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। সেই টাকাও কবে পাব, নাকি আদৌ পাব, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।’
এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় ইনচার্জ মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আগের পরিচালকদের মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বর্তমান পরিচালকেরা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের কথা ভাবছেন। আশা করছি, আগামী জানুয়ারির (২০২৭ সালের) মধ্যে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে সক্ষম হব।’
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি