
কাজের তাগিদে স্ত্রী-সন্তানসহ পরিবারের ছয় সদস্যকে কক্সবাজারে রেখে চুয়াডাঙ্গায় ফিরেছিলেন নুর আলম। ভেবেছিলেন, বেড়ানো শেষে শনিবার (১৭ অক্টোবর) সবাই ফিরবেন আগের মতোই। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁর স্ত্রী ফারিহা কবির, সাত বছরের সন্তান ফায়িজান আহম্মেদসহ পরিবারের ছয় সদস্য। একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়া পরিবারটির আনন্দময় সফর শেষ হয়েছে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে। স্ত্রী-সন্তানসহ প্রিয়জনদের হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন নুর আলম।
নুর আলম বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বাসিন্দা। চাকরির সুবাদে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় একটি ভাড়া বাড়িতে টানা আট বছর ধরে বসবাস করছিলেন তিনি। ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের চুয়াডাঙ্গা মেডিকেল প্রমোশন অফিসার (এমপিও) হিসেবে কর্মরত নুর আলমের সংসারজুড়ে ছিল স্ত্রী-সন্তানকে ঘিরে নানা স্বপ্ন। এক মুহূর্তের ব্যবধানে সেই সংসারেই নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
মুঠোফোনে নুর আলম জানান, গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) তিনি, তাঁর স্ত্রী ফারিহা কবির, সন্তান ফায়িজান আহম্মেদ, তিন শ্যালিকা ও এক শ্যালক কক্সবাজারে বেড়াতে যান। তবে অফিসের কাজ থাকায় শুক্রবার তিনি পরিবারের সদস্যদের সেখানে রেখে কর্মস্থল চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। শনিবার সকালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঢাকায় ছুটে যান তিনি।
নুর আলম বলেন, “আজ শনিবার কক্সবাজার থেকে তাঁদের ফিরে আসার কথা ছিল। কীভাবে রিসোর্টে আগুন লাগল, জানি না। সেখানে আটকা পড়ে আমার স্ত্রী, সন্তানসহ ছয়জন মারা গেছে। এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিলেন তিনি। কয়েক দিন আগেও যাঁদের নিয়ে ছিল আনন্দময় ভ্রমণের পরিকল্পনা, তাঁদের আর কখনো ফিরে পাবেন না—এ বাস্তবতা যেন মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
নুর আলম জানান, তাঁর স্ত্রী ফারিহা কবির অসুস্থ ছিলেন। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে তাঁকে অন্যের সাহায্য নিতে হতো। এ কারণে তাঁর দেখাশোনার সুবিধার্থে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই একসঙ্গে যাওয়াই যে এমন মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।
স্ত্রী-সন্তানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নুর আলম বলেন, “আমার স্ত্রী অসুস্থ ছিলেন। চলাফেরা করতে অন্যের সাহায্য নিতে হয়। এ জন্য একসঙ্গে সবাই গিয়েছিল। এখন সবাই…”—কথা শেষ করতে পারেননি তিনি।
নুর আলমের সাত বছরের সন্তান ফায়িজান আহম্মেদ চুয়াডাঙ্গার প্রদীপন মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। যে বয়সে স্কুল, খেলাধুলা আর পরিবারের স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই আগুনে নিভে গেল শিশুটির জীবন।
শনিবার সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকায় কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগে। এ ঘটনায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।
এদিকে চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় নুর আলমের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, তাঁদের কক্ষটি তালাবদ্ধ। যে বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে টানা আট বছর সংসার করেছেন তিনি, সেই বাড়ি এখন নিস্তব্ধ। ঘরের দরজায় তালা ঝুলছে, অথচ নেই সেই পরিচিত মানুষগুলোর ফিরে আসার অপেক্ষা।
বাড়ির মালিক হারুন আর রশিদ বলেন, “টানা আট বছর ধরে আমার বাড়ির তৃতীয় তলায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া থাকেন নুর আলম। তাঁরা খুবই ভালো মনের মানুষ। ঘটনা শোনার পর তিনি ঢাকায় শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছেন। আসলে এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা।”
কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়া পরিবারটির চুয়াডাঙ্গায় ফেরার কথা ছিল শনিবার। কিন্তু সেই ফেরার অপেক্ষা আর পূরণ হলো না। দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ার ভাড়া বাসায় রয়ে গেল তালাবদ্ধ ঘর, আর নুর আলমের জীবনে নেমে এলো এমন এক শূন্যতা, যা কোনো সান্ত্বনাতেই পূরণ হওয়ার নয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ