
ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় আদালতের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা ও চলমান দেওয়ানি মামলা উপেক্ষা করে একটি মাদ্রাসার নতুন অ্যাডহক কমিটি অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অবাক করার বিষয় হলো, যে মাদ্রাসায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, সেই মামলারই এজাহারভুক্ত আসামিকে রাখা হয়েছে নতুন এই কমিটিতে।
সম্প্রতি আশুলিয়ার শ্রীপুর এলাকার ঐতিহ্যবাহী তাহফিযুল কুরআনিল কারিম ফাযিল (স্নাতক) মাদ্রাসার জন্য এই কমিটির অনুমোদন দেয় ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়।
জানা যায়, ঢাকার আশুলিয়ার শ্রীপুর এলাকার তাহফিযুল কুরআনিল কারিম ফাযিল (স্নাতক) মাদ্রাসা ও এশিয়া আশরাফ মহিলা মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ, ট্রাস্টের মালিকানা ও সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ ও আইনি লড়াই চলে আসছে।
মাদ্রাসার সার্বিক পরিস্থিতি ও সম্পত্তি সুরক্ষার স্বার্থে এর আগে ঢাকার ২য় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে আশরাফ চ্যারিটেবল ট্রাস্টের পক্ষ থেকে একটি নিষেধাজ্ঞার দেওয়ানি মামলা দায়ের করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ সেপ্টেম্বর আদালত ওই সম্পত্তিতে ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। মাদ্রাসার মূল ফটকে আদালতের সেই নোটিশ টানানো হলেও তা তোয়াক্কা না করে গত ১১ অক্টোবর ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. এ. কে. মোহা. নুরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে ছয় মাসের জন্য পাঁচ সদস্যের নতুন অ্যাডহক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
স্থানীয় ও তথ্যসূত্রে জানা যায়, গত এক বছর ধরে এই মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ ও সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও একাধিক ফৌজদারি মামলা হয়েছে। ইতিপূর্বে গত বছরের ২৫ জুন ডা. মোহাম্মদ সালেহউদ্দীন সাঈদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা ও তহবিল তছরুপের অভিযোগ এনে তাঁকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। এর জেরে ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর হামলা ও লুটের অভিযোগে আশুলিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন ট্রাস্টের সেক্রেটারির সহকারী এস.এ.টি. নুরুজ্জামান।
পরবর্তীতে এ বছরের ৯ মার্চ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদা দাবির অভিযোগে উপপরিচালক (প্রশাসন) সৈয়দ সানজিদ আরেকটি মামলা করেন। এ ছাড়া গত ২৭ সেপ্টেম্বর ভাঙচুর ও লাখ লাখ টাকা লুটের অভিযোগে আরও একটি মামলা দায়ের করা হয়। তবে এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিযুক্তরাও একাধিক মামলা করেছেন। সর্বশেষ, একটি পক্ষ মাদ্রাসার কমিটি আনতে গিয়ে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর ও সিল জালিয়াতির ঘটনায় দুজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
মামলার তথ্যসূত্রে জানা যায়, সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা গুরুতর ফৌজদারি মামলাগুলোতে নতুন কমিটির বিদ্যোৎসাহী প্রতিনিধি হিসেবে স্থান পাওয়া প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ সালেহ উদ্দিন সাঈদ নিজেই অন্যতম এজাহারনামীয় অভিযুক্ত আসামি। তিনি আশুলিয়া থানায় দায়ের করা তিনটি মামলার এজাহারনামীয় আসামি। এর মধ্যে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দায়ের করা একটি মামলার ৩ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি তিনি। এ ছাড়া এ বছরের ১১ মার্চের এজাহারে ৮ নম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর দায়ের করা এজাহারে ৭ নম্বর আসামি তিনি।
আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. এ. কে. মোহা. নুরুল ইসলাম জানান, ট্রাস্ট পরিচালিত মাদ্রাসায় অভ্যন্তরীণ বিরোধ থাকতে পারে। তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞার কপি হাতে পেলে তা যাচাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুর রউফ মিয়া বলেন, আদালতের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকা অবস্থায় গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের আসামিকে নিয়ে নতুন কমিটি গঠন সম্পূর্ণ আইনসম্মত নয়। এ বিষয়ে তাঁরা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়ে আইনি পদক্ষেপ নেবেন।
সার্বিক বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, নতুন কমিটির বিষয়টি তিনি শুনেছেন। যারা কমিটি এনেছে, তাদের পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, আইনি পরিস্থিতি না বুঝে তারা আপাতত কোনো মিটিং করতে পারবে না। এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে কোনো অবনতি বা গোলমাল না হয়, সে বিষয়ে তাঁরা সতর্ক রয়েছেন এবং একটি সুষ্ঠু সমাধানের চেষ্টা করছেন।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ