
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দের পর জমে উঠেছে প্রচার-প্রচারণা। পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে অলিগলি থেকে শুরু করে শহরের প্রধান সড়ক পর্যন্ত। ভোটারদের মন জয় করতে ব্যস্ত পাঁচ দলের প্রার্থী। কেউ দিচ্ছেন উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, কেউ গুরুত্ব দিচ্ছেন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও নিরাপদ পরিবেশ গড়ার ওপর। সব মিলিয়ে নির্বাচনি আমেজে মুখর হয়ে উঠেছেন এই আসনের প্রার্থী, সমর্থক এবং ভোটাররা।
৮ অক্টোবর প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দের পরপরই শুরু হয় আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা। এরপর থেকে প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকেরা ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট চাইছেন। শহরের বিভিন্ন সড়ক, পাড়া-মহল্লা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শোভা পাচ্ছে নির্বাচনি পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন।
এ আসনে পাঁচটি রাজনৈতিক দলের পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মো. দেলাওয়ার হোসেন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের বটগাছ প্রতীকে মো. আবদুল আলীম নিজামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকে মো. খাদেমুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের ডাব প্রতীকে হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
প্রচারণায় প্রার্থীরা এলাকার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
উন্নয়ন ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার প্রতিশ্রুতি
বিএনপির প্রার্থী সাবেক পৌরসভার মেয়র ও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়ন, বেকারত্ব দূর করা, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে চাই। শান্তি, সাম্য ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা বাস্তবায়নে ভোটারদের দোয়া ও সমর্থন চাই।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন মনে করেন, এলাকার উন্নয়ন নির্ভর করে জনপ্রতিনিধির সততা, যোগ্যতা ও দুর্নীতিমুক্ত থাকার ওপর। তাঁর মতে, সরকারি বরাদ্দ অব্যাহত থাকে; সেই বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সৎ ও যোগ্য জনপ্রতিনিধি প্রয়োজন। নিরাপদ ও দুর্নীতিমুক্ত ঠাকুরগাঁও গড়তে ভোটারদের কাছে সমর্থন ও ভোট চাইছেন তিনি।
ভোটারদের প্রত্যাশা
ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লী উপজেলার সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমন প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটের প্রচার দেখে তাঁরা আনন্দিত। এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রেখে যিনি উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে সততার সঙ্গে ভূমিকা রাখবেন, তাঁকেই বেছে নিতে চান সাধারণ জনগণ।
ঠাকুরগাঁওয়ের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয় সমাজসেবক রফিকুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁওয়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, মেডিকেল কলেজ নির্মাণ এবং ঐতিহ্যবাহী এয়ারপোর্ট পুনরায় চালুর মতো বেশ কিছু যুগান্তকারী মেগা প্রজেক্টের কাজ শুরু করে গেছেন। ঠাকুরগাঁওবাসীর দীর্ঘদিনের এই স্বপ্নগুলো এখন বাস্তবায়নের পথে। আমরা চাই, এমন একজন যোগ্য অভিভাবক নির্বাচিত হয়ে আসুক, যিনি এই চলমান উন্নয়নের ধারাকে বেগবান রাখবেন এবং জাতীয় সংসদে গিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের এই অধিকারগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরবেন।
আবু সাঈদ বাবু নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের একটি বিশেষ ঐতিহ্য রয়েছে। এখানে সব ধর্মের ও সব মতের মানুষ সবসময় সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে। আমরা প্রত্যাশা করি, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেবে। প্রার্থীরা যেন পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি না করে এলাকার দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা নিয়ে কথা বলেন—এটাই জেলাবাসীর মূল দাবি।
শহরের তরুণ বাসিন্দা রাশেদুল হাসান তন্ময় বলেন, কয়েক দিন ধরে পুরো ঠাকুরগাঁও যেন এক আনন্দের শহর! অলিগলি থেকে শুরু করে বড় বড় মোড়—সবখানে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, হাতপাখাসহ নানা প্রতীকের ব্যানার-পোস্টারে ছেয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর রিকশা আর মাইকের গানের সঙ্গে যে প্রচারণা হচ্ছে, তা দেখতে সত্যিই দারুণ লাগছে। চায়ের দোকানগুলোতেও গভীর রাত পর্যন্ত মুখর আলোচনা চলছে। সত্যিই এক মনোরম বৈচিত্র্যময় নির্বাচনি উৎসবে মেতেছে আমাদের পুরো ঠাকুরগাঁও।
সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি
এদিকে, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচন ঘিরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসনও। পুলিশ সুপার মো. বেলাল হোসেন বলেন, নির্বাচনে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। আশা করি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব হবে।
২৯ অক্টোবর ভোটগ্রহণ
উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে জয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় আইন অনুযায়ী আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।
আগামী ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী এলাকার এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রার্থীদের তৎপরতা। এখন দেখার বিষয়, উন্নয়ন ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতির মধ্যে কোন প্রার্থীকে বেছে নেন ভোটাররা।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ