
কুমিল্লার গুরুত্বপূর্ণ দুই আঞ্চলিক সড়কের সংযোগ রাস্তা বুড়িচং-রাজাপুরের সংস্কার ও প্রশস্তকরণের কাজ নির্ধারিত সময়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সময়মতো কাজ শুরু না করা, দফায় দফায় নোটিশের পরও গাফিলতি এবং পরবর্তীতে চুক্তি বাতিলের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার ঘটনায় থমকে গেছে পুরো প্রকল্প। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একের পর এক রিট ও আইনি জটিলতায় বুড়িচং-রাজাপুর সংযোগ সড়কটির উন্নয়ন পুরোপুরি অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ফলে প্রতিদিন খানাখন্দ আর ধুলাবালিতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এলাকার অর্ধলক্ষাধিক মানুষ।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার প্রধান যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম বুড়িচং ইউপি অফিস থেকে রাজাপুর ইউপি অফিস সংযোগ সড়ক (রোড আইডি: ৪১৯১৮৩০০১, চেইনেজ: ০০–৫৯০০ মিটার)। এটি বুড়িচং সদর থেকে শংকুচাইল ও পার্শ্ববর্তী সীমান্তঘেঁষা জনপদে যাতায়াতের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। স্থানীয় জনগণের সুবিধার্থে বিদ্যমান অপ্রশস্ত রাস্তাটিকে ১৮ থেকে ২৪ ফুটে প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), কুমিল্লা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের কার্যাদেশ পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করতে ব্যর্থ হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘জাকাল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড’। কর্তৃপক্ষের একাধিক তাগাদা ও সতর্কবার্তার পরও সন্তোষজনক অগ্রগতি না থাকায় গত বছরের ৯ জুলাই ২০২৫ তারিখে স্মারক নং ৪৬.০২.১৯০০.০০০.১৪.৬০০.২৪.৪৮৭৫ মূলে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে এলজিইডি। একই সঙ্গে চুক্তির শর্ত ভঙ্গের দায়ে প্রতিষ্ঠানটির জামানত বাবদ থাকা ১ কোটি ৪৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি নগদায়নের (encash) উদ্যোগ নেওয়া হয়। জনস্বার্থ রক্ষায় এলজিইডি কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে নতুন করে রি-টেন্ডার (দরপত্র নং ১২/২০২৫-২৬) আহ্বান করে দ্রুত কাজ শুরুর উদ্যোগ নেয়।
চুক্তি বাতিল ও পুনঃদরপত্র আহ্বানের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জাকাল্লাহ অ্যান্ড ব্রাদার্স লিমিটেড হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন (রিট পিটিশন নং ১১৫২৪/২০২৫) দায়ের করে। রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ নতুন রি-টেন্ডার প্রক্রিয়ার ওপর ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ জারি করেন।
এদিকে, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেন স্থবির না থাকে এবং জনস্বার্থ রক্ষার্থে এলজিইডি কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (সিভিল পিটিশন নং ৩১৬২/২০২৫) দায়ের করেন। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশটি সংশোধন করে মামলার মূল রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষকে বর্তমান অবস্থা অর্থাৎ ‘স্থিতাবস্থা’ (Status Quo) বজায় রাখার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে হাইকোর্টের উপযুক্ত বেঞ্চকে দ্রুততম সময়ে রিটের রুল নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা প্রদান করেন আদালত।
আপিল বিভাগের আদেশে উভয় পক্ষকে ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখতে বলায় বাস্তবে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ কিংবা সংস্কারকাজের কোনো সুযোগ বর্তমানে তৈরি হচ্ছে না। এদিকে, ঠিকাদার আইনি মারপ্যাঁচে সময়ক্ষেপণ করলেও বাস্তবে ভুগছেন পথচারী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও রোগীবাহী পরিবহনের যাত্রীরা। প্রায় ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটির পিচ উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা, আর শুকনা মৌসুমে ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সময়মতো কাজ না করার দায় আজ পুরো উপজেলাবাসীকে নিতে হচ্ছে। কাজ না করে নতুন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আইনি বাধা সৃষ্টি করা জনস্বার্থবিরোধী আচরণের শামিল।
এলাকাবাসীর দাবি, এটি কেবল একটি আইনি বিরোধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা। রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগ দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে এই আইনি অচলাবস্থা দূর করবে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে সড়কটির সংস্কারকাজ পুনরায় চালুর পথ সুগম করবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ