
মাগুরায় জাল সনদপত্র ও বয়স কমিয়ে প্রায় ১৪ বছর ধরে সরকারি চাকরি করার অভিযোগ উঠেছে নির্মল কুমার মালাকারের বিরুদ্ধে। তিনি শ্রীপুর উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে এমএলএসএস/নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, নির্মল কুমার মালাকারের জন্ম নিবন্ধন সনদে জন্মতারিখ ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪। এতে তার স্থায়ী ঠিকানা মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল ইউনিয়নের বরালিদহা গ্রাম এবং পিতা মৃত নরেন্দ্রনাথ মালাকার ও মাতা রেনু বালা মালাকার উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২২ সালের ৩ জুলাই নাকোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হুমাউনুর রশিদ মুহিতের স্বাক্ষরে জন্ম নিবন্ধন সনদটি প্রস্তুত করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। তার জাতীয় পরিচয়পত্র ইস্যুর তারিখ ১০ মার্চ ২০১৮।
অভিযোগকারীদের দাবি, রামনগর হরিপদ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে দেওয়া অষ্টম শ্রেণির ছাড়পত্রেও অসঙ্গতি রয়েছে। ওই ছাড়পত্রে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়ে পড়াশোনার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে এবং পাওনা পরিশোধের তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৭ দেওয়া হয়েছে। তবে ছাড়পত্রে প্রধান শিক্ষক অতুল চন্দ্র বিশ্বাসের সিল ও স্বাক্ষরের তারিখ ২৭ এপ্রিল ২০০৬ উল্লেখ রয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রবেশপত্র অনুযায়ী, নির্মল কুমার মালাকার এমএলএসএস অথবা নিরাপত্তা প্রহরী পদের প্রার্থী ছিলেন। তার রোল নম্বর ৩১৭৭৮৭ এবং লিখিত পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা। প্রবেশপত্রটি ২০১২ সালের ১৭ জানুয়ারি সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ ফরিদপুরের সহযোগী অধ্যাপক গণিত বিভাগের অসীম কুমার সাহা সত্যায়িত করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনে তার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ১৪৭৩১২১২৯৯ উল্লেখ রয়েছে। মাগুরা জেলা বিশেষ শাখার তৎকালীন এএসআই মিরন এ প্রতিবেদন দাখিল করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ফরিদপুর কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, নির্মল কুমার মালাকারের যোগদানের তারিখ ১৭ জানুয়ারি ২০১২। প্রথমে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার জাহাপুর ইউনিয়নে কর্মস্থল ছিল। পরে ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট তাকে মধুখালীর কামারখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র থেকে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার সব্দালপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে বদলি করা হয়।
তবে রামনগর হরিপদ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী রজব আলী শেখ দাবি করেন, নির্মল কুমার মালাকারের অষ্টম শ্রেণির ছাড়পত্রে তার কোনো স্বাক্ষর নেই। তিনি বলেন, ‘আমি ১৯৮৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এই স্কুলে চাকরি করেছি। ওই সময়ে অষ্টম শ্রেণির ছাড়পত্রে ক, খ, গ ও ঘ—এই চারটি অপশন থাকত। আমি ঘ অপশনে প্রধান সহকারীর সিল ও স্বাক্ষর দিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির সাল থেকে অষ্টম শ্রেণির সাল লিখে দিতাম। রেজিস্ট্রারের ভর্তি বইয়ের পাতা ও সিরিয়াল নম্বরও উল্লেখ করতাম। কিন্তু নির্মল কুমার মালাকারের অষ্টম শ্রেণির ছাড়পত্রে ২০০৬ সালে আমার সিল ও স্বাক্ষর নেই।’
রজব আলী আরও দাবি করেন, নির্মল কুমার মালাকার ওই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেননি। তবে এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের পুরোনো নথি যাচাই প্রয়োজন বলে জানান বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অলোকা বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘১৯৯৫ সালের ষষ্ঠ শ্রেণির রেজিস্টার ভর্তি খাতা ২০১৫ সালে চুরি হয়ে গেছে। আমাকে সাতদিন সময় দেন, খাতা খুঁজে দেখি।’
অভিযোগের বিষয়ে নির্মল কুমার মালাকার বলেন, ‘আমার সবকিছু ঠিক আছে। আপনি আমার বিরুদ্ধে যা কিছু তাই করেন, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। চাকরি চলে গেলে ভ্যান, রিকশা ও মাঠে জন দেব এবং আপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব, দেখেও নেব।’
মাগুরা জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক গাজী বশির আহমেদ বলেন, ‘অভিযোগগুলো লিখিত আকারে আবেদন করে জমা দেন। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ। অভিযোগগুলো যাচাই করে সনদপত্র, বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নিয়োগসংক্রান্ত নথির সত্যতা নির্ধারণের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি