
বান্দরবানের আলীকদমে গভীর রাতে নির্মাণকাজের স্থান থেকে দুই শ্রমিককে অস্ত্রের মুখে অপহরণের অভিযোগ উঠেছে। ডিম পাহাড়সংলগ্ন থানচি সড়কের ২৩ কিলোমিটার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অপহরণের পর তাঁদের ছেড়ে দিতে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ সময় অপহৃত দুই শ্রমিককে মারধর করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। ঘটনার পর সেনাবাহিনীর আলীকদম জোন, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। পরে ৩ অক্টোবর সকালে থানচি সড়কের ১০ কিলোমিটার এলাকা থেকে তাঁদের উদ্ধার করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি বরাদ্দের আওতায় বান্দরবান জেলা প্রশাসন ও আলীকদম উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ডিম পাহাড়সংলগ্ন ২৩ কিলোমিটার এলাকায় দোকান প্লট ও পর্যটন স্পট নির্মাণের কাজ চলছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে হেডমাঝি এরশাদের নেতৃত্বে চার শ্রমিক সেখানে কাজ করছিলেন। ১ অক্টোবর দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে চার সদস্যের একটি সশস্ত্র দল নির্মাণস্থলে আসে বলে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অস্ত্র প্রদর্শন করে ওই দল আমিন (২৮) ও শামুসু (৩৮) নামে দুই শ্রমিককে সঙ্গে নিয়ে যায়। একই সময় ঘটনাস্থলে থাকা অপর দুই শ্রমিকের কাছ থেকে দুটি মুঠোফোন নিয়ে যাওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
অপহৃত আমিনের ঠিকানা সাতকানিয়া-লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম। শামুসু আলীকদম সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সশস্ত্র দলের একজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র এবং অপরজনের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল। অপহরণের পর দুই শ্রমিককে মারধর করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে তাঁদের কীভাবে এবং কোথায় মারধর করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। দলটির পরিচয়, সদস্যদের নাম কিংবা কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনার সময় নির্মাণস্থলে থাকা অপর দুই শ্রমিক মো. ইমরান (১৭) ও সাহিদুল ইসলাম (১৬) কোনোভাবে সেখান থেকে সরে যান। পরে কিছু দূর হেঁটে মোটরসাইকেলে করে তাঁরা আলীকদমে চলে আসেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে তাঁরা নিরাপদে রয়েছেন।
অপহরণের পরই সামনে আসে মুক্তিপণের দাবি। অভিযোগ অনুযায়ী, অপহৃত শ্রমিকদের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া মুঠোফোন ব্যবহার করে হেডমাঝি এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এ সময় দুই শ্রমিককে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কয়েকটি মুঠোফোন নম্বরের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে মুক্তিপণের দাবির নেপথ্যে কারা রয়েছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলমের নেতৃত্বে প্রশাসনিক তৎপরতা শুরু হয়। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর আলীকদম জোন ও আলীকদম থানা পুলিশ উদ্ধার অভিযান শুরু করে। ২ অক্টোবর দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সংশ্লিষ্ট দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। স্থানীয় পর্যায়ে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালামও উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত হন। তিনি বলেন, অপহরণের বিষয়টি পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরী ও তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীকে অবহিত করা হয়েছে। এরপর সেনাবাহিনী, পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত তৎপরতা জোরদার করা হয়।
সর্বশেষ ৩ অক্টোবর সকালে থানচি সড়কের ১০ কিলোমিটার এলাকা থেকে দুই শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। উদ্ধারের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলমের ব্যবস্থাপনায় তাঁদের আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁদের শারীরিক পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
আলীকদম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাহেদ পারভেজ বলেন, দুই শ্রমিককে অপহরণের বিষয়টি জানার পর পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত ও উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয়। সেনাবাহিনী, উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, অপহরণের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত এবং ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়। জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অপহরণের পর দুই শ্রমিককে কোথায় রাখা হয়েছিল, তাঁদের ওপর হামলা বা মারধরের ঘটনা কীভাবে ঘটেছে, মুক্তিপণের দাবির নেপথ্যে কারা ছিল এবং ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও মুঠোফোনের বিষয়ে কী তথ্য পাওয়া গেছে, এসব বিষয় এখনো তদন্তাধীন। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্বদেশ প্রতিদিন/এফএইচ