
পাহাড়ের বুকের গভীরে অন্ধকার এক পথ। বাইরে সবুজের সমারোহ, নিচে স্বচ্ছ ঝিরির পানি। অথচ কয়েক পা এগোলেই হারিয়ে যায় দিনের আলো। টর্চের ক্ষীণ আলোয় পাথুরে দেয়াল ছুঁয়ে এগোতে হয় সামনে। কোথাও পথ সরু, কোথাও মাথার ওপর পাথরের ছাদ। অন্ধকার সেই পথ পেরিয়ে গুহার অন্য প্রান্তে বের হলেই আবার দেখা মেলে আলোর। বান্দরবানের আলীকদমে প্রকৃতির এমনই রহস্যময় সৃষ্টি ‘আলী সুড়ঙ্গ’ এখন অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের অন্যতম স্থান।
আলী সুড়ঙ্গে যেতে হলে উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মংচপ্রু পাড়ায় যেতে হয়। সেখানে যানবাহনের পথ শেষ করে শুরু হয় পায়ে হাঁটার যাত্রা। হালকা জঙ্গল পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় তৈনখালের তীরে। রংরাং পাহাড় থেকে নেমে আসা এই খালের তীর ধরে দুই পাহাড়ের মাঝের সরু ঝিরিপথে আরও প্রায় ৪০০ মিটার এগোলেই দেখা মেলে পাহাড়ের খাদে লুকিয়ে থাকা সুড়ঙ্গটির।
সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখ ঝিরির পানিপ্রবাহ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট ওপরে। দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পাথুরে পাহাড় অনেকটা দেয়ালের মতো। আগে সুড়ঙ্গে ওঠার পথ ছিল বেশ কঠিন। পরে আলীকদম সেনা জোনের উদ্যোগে দুই ধাপে লোহার সিঁড়ি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সিঁড়িগুলো ভালো অবস্থায় থাকায় দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।
স্থানীয় ট্যুর গাইডদের তথ্য অনুযায়ী, আলী সুড়ঙ্গের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৮০ থেকে ৯০ ফুট। প্রবেশের কয়েক ফুট পরই কমতে থাকে আলো। এরপর টর্চ কিংবা মোবাইলের আলোই হয়ে ওঠে পথচলার ভরসা। কিছুদূর যাওয়ার পর সুড়ঙ্গের একটি অংশ সংকীর্ণ হয়ে গেছে। সেই অংশ পার হতে কিছুটা কষ্ট হলেও এরপর গুহার অন্য প্রান্ত দিয়ে বের হওয়া যায়। অন্ধকার অংশে রয়েছে বাদুড়ের বিচরণ। ভেতরে পানির শব্দ ও পাথুরে দেয়ালের প্রতিধ্বনি পুরো পরিবেশকে করে তোলে আরও রহস্যময়।
তবে আলী সুড়ঙ্গের আকর্ষণ শুধু গুহার অন্ধকারে সীমাবদ্ধ নয়। সেখানে পৌঁছানোর পুরো পথটিই যেন আলাদা এক অ্যাডভেঞ্চার। ঘন সবুজ বন, খাড়া পাথরের পাহাড়, তৈনখালের স্বচ্ছ পানি আর সরু ঝিরিপথ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক পরিবেশ। দুর্গমতার কারণে সাধারণ পর্যটনের পাশাপাশি প্রকৃতি ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মানুষের কাছেও জায়গাটি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে।
আলী সুড়ঙ্গের রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এর নামকরণের গল্পও। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, ‘আলেকোয়াতং’ নামের সঙ্গে এ এলাকার নামের সম্পর্ক রয়েছে। মারমা ভাষায় ‘আলে’ অর্থ উৎসর্গ বা পূজা, ‘কোয়া’ অর্থ কবুতর এবং ‘তং’ অর্থ পাহাড়। একসময় ওই পাহাড়ে বুনো কবুতরের বিচরণ ছিল। স্থানীয়দের বিভিন্ন মানত ও উৎসর্গের সঙ্গেও পাহাড়টির সম্পর্ক ছিল বলে তাঁদের ধারণা। তবে আলী সুড়ঙ্গের নামকরণ ও এর সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট ইতিহাসের লিখিত প্রমাণ স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় না।
ছুটির দিনগুলোতে আলী সুড়ঙ্গে পর্যটকের উপস্থিতি বাড়ে। স্থানীয় ট্যুর গাইডদের মতে, প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই গুহা দেখতে আসেন। কেউ পাহাড়ি প্রকৃতির টানে, কেউ আবার অন্ধকার সুড়ঙ্গের রোমাঞ্চ উপভোগ করতে। বর্তমানে এখানে স্থায়ী নিরাপত্তাকর্মী বা নির্দিষ্ট গাইডের ব্যবস্থা নেই। ফলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত গাইডদের সহায়তা নিয়েই অনেকে দুর্গম পথ পাড়ি দেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আলী সুড়ঙ্গে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের দুর্ঘটনার কোনো রেকর্ড নেই। তারপরও বর্ষাকালে ঝিরির পানির স্রোত ও পাথুরে পথের কারণে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে সুড়ঙ্গের সংকীর্ণ অংশে প্রবেশের সময় সতর্ক থাকা জরুরি। পর্যটকদের জন্য তথ্যসমৃদ্ধ সাইনবোর্ড, নির্দিষ্ট গাইডের ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে জায়গাটির পর্যটন সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে।
প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে তৈরি এই সুড়ঙ্গের রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। নামের ইতিহাস, গুহার সৃষ্টি আর পাহাড়ি পথের রোমাঞ্চ মিলিয়ে আলী সুড়ঙ্গ যেন আলীকদমের বুকের লুকানো এক গল্প। সেই গল্পের টানেই দুর্গম পাহাড় পেরিয়ে সেখানে পৌঁছাচ্ছেন মানুষ। পাহাড়ের অন্ধকার পথ পেরিয়ে যখন গুহার অন্য প্রান্তে আলোর দেখা মেলে, তখন কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়—প্রকৃতির তৈরি রহস্যের চেয়ে বড় কোনো আয়োজন হয়তো মানুষের হাতে তৈরি করা সম্ভব নয়।
স্বদেশ প্রতিদিন/এস পি