রোববার ২৭ নভেম্বর ২০২২ ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

বাড়ছে বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা
শাদমান ইয়াসির
প্রকাশ: বুধবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২২, ৮:২৫ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

বাড়ছে বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা
বাংলাদেশ শিক্ষা এবং শিক্ষার্থী বান্ধব দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ থেকেই শিক্ষার গুণগত মানে এগিয়ে ছিলো বাংলাদেশ। ভূটানের প্রধানমন্ত্রীও বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ছিলেন। এখনও যে বাইরে থেকে শিক্ষার্থী আসেনা তা নয়। তবে পূর্বের তুলনায় অত্যন্ত কম। তবে বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে বিদেশের বিভিন্ন দেশে উচ্চ শিক্ষার জন্যে যাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনেক বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সুযোগ থাকলে দেশ ছাড়ার প্রবণতা বেড়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে GRE, Toffel, IELTS এর মতো বিদেশ যাওয়ার সার্টিফিকেট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা। এজন্য কে দায়ী এবং কেনই বা বাড়ছে বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। বিগত কয়েক বছরে কোনো কোনো দেশে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যাওয়ার হার বেড়েছে দ্বিগুণ। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে তৈরির সুযোগও প্রসার হচ্ছে। ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের তথ্য পর্যালোচনা করে এমনটাই জানা গেছে। 

পর্যালোচনায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, মালয়েশিয়া, চীন, জাপান ইত্যাদি দেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেড়েছে। তাদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, উন্নত ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার কারণে দেশটির খ্যাতনামা বেশ কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষালাভের সুযোগ নিতে চান বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। 

সূত্র বলছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮ হাজার ২৪৯ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। ২০০৯ সালের চেয়ে এ সংখ্যা এখন প্রায় তিন গুণ। তবে এক বছরের ব্যবধানেই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বেড়েছে ১০ গুণেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশই বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, গণিত ও প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পর বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অন্যতম গন্তব্য যুক্তরাজ্য। এই পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন। চলতি বছর থেকে যুক্তরাজ্যের গ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্স কোর্স শেষে দেশটিতে দুই বছর চাকরিরও সুযোগ পাবেন বাংলাদেশিরা। প্রায় আট বছর পর যুক্তরাজ্য সরকার এই নিয়ম ফের চালু করতে চলেছে। সে কারণে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আবারও শিক্ষার সুযোগ প্রসারিত হবে।

এদিকে ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশ জার্মানিতেও বাড়ছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। ২০১৮ সালে জার্মানিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২২০ জন। ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২৭৭ জন। ২০১৫ সালে ২ হাজার ৫১৪ জন। ২০১৬ সালে ছিল ২ হাজার ৬৩২ জন। আর ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৬৪ জন। 

জার্মান সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছরই দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়ছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ১৩ শতাংশই জার্মানিতে পড়াশোনা করছেন। ঢাকায় নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোলজ বলেন, জার্মানিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এই সুযোগ নিতে পারে। এছাড়া জার্মান একাডেমিক এক্সচেঞ্জ সার্ভিসের (ডাড) আওতায় শিক্ষার্থীদের স্কলারশিপের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা এ সুযোগ নিচ্ছেন। আগামী দিনে আরো বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জার্মানিতে পড়ার সুযোগ পাবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

এদিকে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর নতুন গন্তব্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া। দেশটির সরকারের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে সেখানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২৮ হাজার। বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী হওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে, দেশটিতে পড়তে যেতে চাইলে কোনো আইইএলটিসের প্রয়োজন হয় না। খরচও তুলনামূলক কম, নিরাপদ ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, প্লেন ভাড়া কম, হালাল খাবার উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে পূর্ব এশিয়ার দেশ চীনও। গত বছর ৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী চীনে পড়াশোনা করতে গেছেন। বেইজিং ছাড়াও কুনমিং, গুয়াংজু, সাংহাই, উহান প্রভৃতি প্রদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছেন এসব শিক্ষার্থীরা। 

ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেন, চীনে বাংলাদেশিদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ছে। আগামীতে এই সুযোগ আরো বাড়বে বলে প্রত্যাশা করি।

জাপান স্টুডেন্ট সার্ভিস অর্গানাইজেশনের (জেএএসএসও) তথ্যানুযায়ী, জাপানেও কম নেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। ‘সূর্যোদয়ের দেশ’ হিসেবে খ্যাত বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশটিতে ২০১৯ সালেই পড়াশোনা করতে গেছেন ৩ হাজার ৬৪০ জন শিক্ষার্থী। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, রাশিয়া ছাড়া প্রতিবেশী দেশ ভারতেও দিনে দিনে বাড়ছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের এ বিদেশমুখীতার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীর প্রাচুর্য, দেশে উচ্চশিক্ষার অপ্রতুল সুযোগ এবং একই সঙ্গে দেশের বাইরে পড়ার খরচ জোগাতে সক্ষম মধ্যবিত্ত শ্রেণির উন্মেষ। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে এ শ্রেণির বিকাশ লক্ষ করার মতো। দ্য বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের অনুমান, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত ও বিত্তবান শ্রেণীর মানুষ বছরে ১০ শতাংশেরও বেশি হারে বাড়ছে। ফলে এ শ্রেণীর মানুষের সংখ্যা ২০২৫ সাল নাগাদ ৩ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছবে, ২০১৫ সালে যেখানে সংখ্যাটি ছিল ১ কোটি ২০ লাখ।

নিম্ন জীবনমান, দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তাও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী করছে। বিদেশে পড়তে যাওয়া এসব তরুণের অধিকাংশই ধনী পরিবারের। আর তাদের পড়াশোনার মাধ্যম ইংরেজি, যাদের অনেকেই পাঠ শেষে আর দেশে ফেরেন না।

এছাড়াও দেশে উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এ শ্রেণির অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের দেশে পড়াশোনা করাতে চাইছেন না। ফলে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের একটি বড় অংশ পড়াশোনার জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিদেশযাত্রায় দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, এমনটা বলা যাবে না। কারণ এ শিক্ষার্থীদের ক্ষুদ্র অংশই ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসছে। এটি একধরনের মেধা পাঁচার। দেশে ভালো কর্মসংস্থান নেই। আবার শিক্ষার্থীরা দেশে ফেরত আসার তাগিদও অনুভব করছেন না। এরকম চলতে থাকলে দেশের মেধা বিদেশে পাচার রোধ কেউ ঠেকাতে পারবে না। ইতিমধ্যে দেশে মেধাবী শিক্ষার্থীদের হার দিন দিন কমছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা নেই বললেই চলে। ফলে আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে দেখা যায়, পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর ইউনিভার্সিটিগুলো জায়গা করে নিতে পারলেও বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো উন্নতি নেই। তাই দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশকে শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব করতে হবে।

স্বদেশপ্রতিদিন/এমএস 





« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: +৮৮০২-৮৮৩২৬৮৪-৬, মোবাইল: ০১৪০৪-৪৯৯৭৭২। ই-মেইল : e-mail: swadeshnewsbd24@gmail.com, info@swadeshpratidin.com
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।