রোববার ১৩ জুন ২০২১ ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

কবি নজরুলের বন্ধ ক্যাম্পাসে ৪১ লাখ টাকার ইন্টারনেট বিল!
বায়েজিদ হাসান, জাককানইবি প্রতিনিধি :
প্রকাশ: বুধবার, ৯ জুন, ২০২১, ৬:২৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে

করোনা মহামারির কারণে এক বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাককানইবি) ইন্টারনেট বিল বাবদ বিপুল অংকের অর্থ খরচ দেখানো হয়েছে। ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের জুন মাস পর্যন্ত ১৫ মাস সময়ে ইন্টারনেট বিল বাবদ বিশ্ববিদ্যালয়ে খরচ দেখানো হয়েছে ৪১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ ও বিভিন্ন সংস্কার বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে আরও দুই লাখ টাকার বেশি। বিপুল অর্থ ব্যয়েও প্রত্যাশিত সেবা মিলছে না শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। দুই প্রতিষ্ঠান থেকে ইন্টারনেট ব্যবহার দেখিয়ে এই ব্যয় দেখানো হয়েছে। যার একটি বাংলাদেশ গবেষণা ও শিক্ষা নেটওয়ার্ক (বিডিরেন) এবং অন্যটি স্থানীয় ইন্টারনেট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ‘ত্রিশাল নেট'। 

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বাধ্যতামূলকভাবে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়কে বিডিরেন-এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ করেছে। ৩টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে এই চুক্তি বাস্তবায়ন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ‘সি' ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ৪০০ এমবি/পিএস-এর ইন্টারনেট সেবা পেয়ে থাকে। যার মাসিক খরচ ২ লাখ টাকা, তিন মাস অন্তর অন্তর যার বিল প্রদান করা হয়। এই বিল ইউজিসি পরিশোধ করে থাকে। ইন্টারনেট ব্যবহার খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ আগে থেকেই অর্থ সংরক্ষণে রাখে ইউজিসি। প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়কে বাধ্যতামূলকভাবে এই সেবা গ্রহণ করতে হয়। ইন্টারনেট সেবা গ্রহণ না করতে চাইলেও নিয়ম অনুযায়ী গুনতে হবে প্রতি মাসে ২ লাখ টাকা। 

বিডিরেন প্রতিষ্ঠানটির সার্ভিস থেকে নিরবিচ্ছিন্ন সেবার সংকট সমাধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি ক্রয় করছে স্থানীয় ইন্টারনেট বিতরণ প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়তি ইন্টারনেট ব্যবস্থার। যার জন্য গুনতে হচ্ছে প্রতি মাসে ৭৫ হাজার টাকা, যা বছর শেষে দাঁড়ায় ৯ লাখ টাকা। এছাড়া বিভিন্ন সময় এই খাতে বিভিন্ন ডিভাইস ক্রয় ও সংস্কারকাজে বছরে ব্যয় করা হয় দুই লাখ টাকার বেশি। যা ২০২০-২১ সাল পর্যন্ত ব্যয় খাতে দেখা গিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনেট সেবার আওতায় ২৩টি একাডেমিক বিভাগসহ রয়েছে প্রশাসনিক বিভিন্ন দফতর পাশাপাশি দুটি আবাসিক হল, ৩টি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ডরমিটরি এবং উপাচার্যের বাসভবন। ছুটিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধ ছিল বিভিন্ন বিভাগের দাফতরিক কার্যক্রম, পাশাপাশি বন্ধ ছিল আবাসিক হল। বন্ধ এই সময়েও চালু ছিল স্বাভাবিক সময়ের মতো ইন্টারনেট ক্রয়। 

বিশ্ববিদ্যালয়টির আইসিটি দফতরের সহযোগিতায় দেখা গেছে, বন্ধ থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব থেকে বেশি ইন্টারনেট ব্যবহার করা হয়েছে প্রতিদিন গড়ে ৩-৪ ঘণ্টা। আরেক বিটভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ইন্টারনেট সেবার মধ্যে সক্রিয় সেবা নিয়েছে কেবল ৩টি ডরমিটরি এবং উপাচার্যের বাসভবন। যা ডাটার পরিমাণ হিসেবে গড়ে মাসপ্রতি ৪ হাজার জিবি প্রায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বিভাগ, প্রশাসনিক অধিকাংশ দপ্তর বন্ধ থাকার এই সময়ে এত টাকার ইন্টারনেট সেবা গ্রহণ করাকে অন্যায় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় বলেছেন একাধিক শিক্ষক এবং কর্মকর্তা। 

বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার খাতে অর্থের ব্যয় নিয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) ড. হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘এই নিয়ে আলোচনা আমাদের হয়েছে। তাই এটি কীভাবে সমাধানে আনা যায় সেই লক্ষ্যে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা এই নিয়ে নতুনভাবে কাজ করবে। তাছাড়া ইতিমধ্যে ইন্টারনেট খাতে ব্যয় কমানোর জন্য বিভিন্ন প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের মধ্যে আলোচনা চলমান রয়েছে।' 

আইসিটি সংশ্লিষ্ট কমিটির আহ্বায়ক ড. মো. সেলিম আল মামুন বলেন, ‘এই বন্ধ সময়েও একই খরচ হয়েছে কি না আমার জানা নেই। আমি খোঁজ নিয়ে দেখব। এছাড়া কীভাবে স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট সেবা প্রদান করা যাবে সেটি নিয়েও কাজ করা হবে।' 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ে নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আল জাবির বলেন, ‘আমি নিজে সপ্তাহে ১০ জিবি কিনে ইন্টারনেট ব্যবহার করছি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে এই খাতে সেই পরিমাণ সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সমস্যাটির সমাধান করবে বলে আশা করি।' 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত একটি বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, ‘ক্যাম্পাস বন্ধের অধিকাংশ সময়জুড়ে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা নিজের গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করেছেন, অনেকে ময়মনসিংহ শহরে অবস্থান করেছেন। সেই সঙ্গে অনেক কর্মকর্তাও। আবার অনলাইনে ক্লাস গ্রহণের ক্ষেত্রেও আমার জানামতে অধিকাংশ শিক্ষক নিজ ডাটা ক্রয় করে ক্লাস নিয়েছেন। এই সময়ে এত অর্থের ব্যয় এই খাতে দুঃখজনক।' 

ইন্টারনেট বিল বাবদ বিপুল অর্থ ছাড় করার বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ ও হিসাব শাখার পরিচালক ড. মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এই নিয়ে কথা বলেছিলাম। আগের ইন্টারনেট সংশ্লিষ্ট কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা সেটি করেছি। যার মধ্যে বিডিরেন-এর বিল আমাদের দিতে হয় না। এটি বাজেটের শুরুতেই ইউজিসি কেটে রেখে দেয় আমাদের এই খাতের মোট বরাদ্দ থেকে। আমরা কেবল স্থানীয়ভাবে যে ইন্টারনেট সেবা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রহণ করে সেটির বিল পরিশোধ করি।' 

সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, শুধুমাত্র ইন্টারনেট বিলই অতিরিক্ত ভাবলে ভুল হবে। এর বাইরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংস্কারের কথা বলে এবং ডিভাইস ক্রয়ের কথা বলে প্রতি মাসের বিলের থেকেও বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়।' 

প্রসঙ্গত, এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্নিবীণা হলের ইন্টারনেট সেবা এবং ডিভাইস ক্রয় সংক্রান্ত কাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। 

স্বদেশ প্রতিদিন/এস

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।