রোববার ১৩ জুন ২০২১ ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

বইয়ে ধুলো জমে গেছে, স্মার্টফোনে আসক্ত শিক্ষার্থীরা
মো.শাহাদাত হোসেন নিশাদ
প্রকাশ: সোমবার, ৭ জুন, ২০২১, ৭:৫৬ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

গত দেড় বছর ধরে করোনা পরিস্থিতি ঘুণ ধরিয়ে দিয়েছে শিক্ষাব্যবস্থায়। শ্রেণী কক্ষের পাঠদান আর ক্যাম্পাসের সেই সজিবতার রূপ আজ নিষ্প্রাণ। যে মাঠে খেলাধুলায় মেতে থাকতো শিক্ষার্থীরা , সেই মাঠ আজ গবাদী পশুদের দখলে। করোনার কারণে এক বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বর্তমানে তাদের পাঠ্য পুস্তকের সাথে সম্পর্ক কমে গেছে। বই গুলোতে আজ ধুলো পড়ে গেছে। আসক্ত হয়ে পড়ছে মোবাইল ফোনে। আবার অনেকে খারাপ ছেলেদের সাথে মিশে বিভিন্ন ধরনের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। এতে বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ। তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং।শুধু শহরের ছেলে মেয়েরাই নয় করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শহরের সাথে সমানভাবে তাল মিলিয়ে গ্রাম বা পল্লী অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে। অনলাইন ক্লাসের নামে শিশু থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকে পড়ছে মোবাইল আসক্তে। আবার অনেকের পড়াশোনায় ঢিলেমি দিয়ে বেকার সময় কাটাচ্ছে। এতে মানসিক ভারসাম্যহীনতার মধ্যে পড়ছে তারা। শুধু তাই নয় গ্রাম অঞ্চলেতো এখন বাল্যবিয়ের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। সাধারণ পরিবারগুলোর ধারণা দীর্ঘসময়ে ছেলে মেয়ে বাড়ী বসে আছে তাই মেয়েদেরকে প্রাপ্ত বয়স হওয়ার আগে বিয়ে আর ছেলেদের কর্মজীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। আর অলস সময়ে এখন শিক্ষার্থীদের সঙ্গি একটি স্মার্টফোন।

দেখা যায়, গ্রামে কারো বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে পাড়া মহল্লার ছেলেরা দল বেঁধে সেই বাড়ির পাশে বসে সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে খেলা করছে। আবার অনেককে বাজারেও দেখা যায় মোবাইল নিয়ে কি যেন করছে।বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা এখন সকাল থেকে শুরু করে ১০/১২ জন করে একসাথে বসে বিভিন্ন গেমস খেলায় মেতে থাকে। আবার দুপুর গড়িয়ে বিকেল পড়তে না পড়তেই শুরু হয়ে যায় একই কাজে। বর্তমানে পাবজি, ফ্রি ফায়ার গেমস এ তারা বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে।তাদেরইবা কি দোষ? করোনার শুরুতে পড়াশোনার একটু চাপ থাকলেও এখন কিছুই নেই। নেই পাঠ্য বইয়ের সাথে কোন সম্পর্ক।একের পর এক পাবলিক পরিক্ষা গুলো নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত আসছে। যেদিও অটোপাশ দিয়ে শিক্ষার্থীদের গতবছর জেএসসি,এইচ.এস.সি পরিক্ষার্থীদের একটা মূল্যয়ন করা হয়েছে কিন্তু এতেও অসন্তুষ্ট অনেকে।এদিকে এখনো পর্যন্ত এসএসসি পরিক্ষার্থীদের নিয়ে কোন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেই। যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই মাধ্যমিক পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবকের পাশাপাশি প্রশাসনের সমান উদ্বেগ প্রত্যাশিত। এটা সত্য যে, করোনা দুর্যোগের কারণে এ বছরের এসএসসি এবং এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার পাঠ্যসূচি সংক্ষিপ্ত করে অন্তত দুই মাস ক্লাস নিয়ে জুনে পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নির্ধারিত ৩০ মার্চে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তো খোলেইনি, উপরন্তু চলছে লকডাউন। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ সংগত। শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যানরা অবশ্য বিদ্যালয় খুলে দেওয়ার পর ৬০ কর্মদিবস ক্লাস নিয়ে আরও ১৫ দিন সময় দিয়ে তবেই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন। অবস্থার আলোকে তাদের বক্তব্য মেনে নেওয়ার বিকল্পও নেই। তাই শিক্ষার্থীদের ঘরে বসে নিজ দায়িত্বেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। স্বাভাবিক অবস্থায় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার আগে শিক্ষকদের সংস্পর্শে থেকে যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। ভালো প্রস্তুতি গ্রহণ কিংবা কঠিন বিষয়াবলি সহজে বোঝার জন্য শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষকরা নানাভাবে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করে থাকেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা সেভাবে সাহায্য গ্রহণ করতে পারছে না। অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষকদের পাওয়া গেলেও তা যথেষ্ট নয়। তার চেয়ে বড় বিষয়, গ্রামের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই দূরশিখন প্রক্রিয়ার বাইরে। কিছু শিক্ষার্থী পরিবারের সহায়তা পেলেও অন্যদের নির্ভর করতে হচ্ছে নিজের প্রস্তুতির ওপর। যদিও ১২ জুন স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছে। তারপরও স্পষ্টত তা করোনা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। বস্তুত করোনাভাইরাসে সর্বাধিক বিপর্যস্ত আমাদের শিক্ষা খাত। আমরা দেখেছি, টানা বন্ধের কারণে শিক্ষাবর্ষ বিশৃঙ্খল হয়েছে। দেশের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে অন্তত দেড় বছরের সেশনজট। এইচএসসি, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেটের মতো পাবলিক পরীক্ষা ও বিদ্যালয়গুলোর ২০২০ সালের বার্ষিক পরীক্ষা বাতিল করায় সারাদেশের প্রায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থী সিলেবাস শেষ না করেই 'অটো পাস' করে। আমরা প্রত্যাশা করি, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেই প্রশাসন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে কোনো বিলম্ব সংগত হবে না। আমাদের মনে আছে, গত বছরের শেষদিকে করোনা সংক্রমণ কমলেও, এমনকি সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চললেও প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিতে দেরিহওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে ফিরতেই পারেনি। মাঝে অন্তত কয়েক মাস শ্রেণি কার্যক্রম চালু থাকলে শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হতো। 

মনে রাখতে হবে, করোনা দুর্যোগ বৈশ্বিক সংকট। এখানে কারও হাত নেই। পরিস্থিতির আলোকেই সরকার লকডাউনসহ প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। দুর্যোগের এ সময়ে নিজেদের সুরক্ষিত রেখে ঘরে থেকেই প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার মধ্যে মঙ্গল। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা কাম্য। এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিদ্যালয়ের উদ্যোগে শিক্ষকদের নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। অনলাইন কিংবা মোবাইল ফোনে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রস্তুতির সার্বিক খোঁজখবর রাখলে শিক্ষার্থীদের মনোবল ধরে রাখা সহজ হবে।

আর বর্তমান এ পরিস্থিতিতে পরিবারকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। সরকার চাইলেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিতে পারে কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো খুলে দিলে হয়তো বিপরিত ফলও হতে পারে। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিলে শিক্ষার্থীরা গণহারে হল গুলোতে আসতে শুধু করবে। এতে করে শিক্ষার্থীরা অবাধ মেলামেশা, দলবেধে আড্ডা শুরু করবে যা হয়তো সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। তাই সরকার এইসব পারিপাশ্বিক চিন্তা করে এখনো সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। তাই বলে পরিবার যদি শিক্ষার্থীদের পাশে না থেকে তাদের উপর বিভিন্ন চাপ প্রয়োগ করতে থাকে তাহলে শিক্ষার্থীরা মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়বে।
 
এছাড়াও পরিবার যদি এই সময়টাতে তাদের ছেলে মেয়ের পাশে না থেকে তাদেরকে সময় না দেয় তাহলে তারা মোবাইল ফোনে আসক্তিসহ বিভিন্ন অসামাজিক কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে। তাই এই সময়টাতে অন্তত পরিবারকে তাদের পাশে থাকা উচিৎ। 

কিছু কিছু অভিবাবক আছে সকালে অফিসে যায় আর ফিরে আসে সেই সন্ধ্যায়। কোন কোন দিন রাতও হয়। বাসায় ছেলেকে ঠিক মতো সময় দিতে পারে না। প্রাইভেট টিউটর আসে। তিনি একটু সময় দেয়। সেই সময় ছাড়া আর কোন সময় ছেলে বই ধরে কি না সেই খবর রাখে না। তাহলে কিন্তু ছেলে দিন দিন অন্য মনস্ক হয়ে পড়বে, একেবারে একগুঁয়ে হয়ে পড়বে যা পরবর্তীদের তাদের জীবনকে ধ্বংসের মুখে পড়বে।

তাছাড়া এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার সময়ে শিক্ষার্থীরা যেভাবে মোবাইল বা ল্যাপটপ নিয়ে পরে থাকে এতে তারা একসময় মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে। এতে বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে রুচিহীনতা, মোবাইল ফোন দীর্ঘ সময় দেখলে দৃষ্টি শক্তির সমস্যাও হতে পারে। তাই এসময় শিক্ষার্থীরা মোবাইল ফোনে আসক্ত না হয়ে মাঠে খেলাধুলা করতে পারে এবং ধুলো জমে থাকা বইগুলো পরিস্কার করে আবার আগের মত পড়ালেখা চালু করে দিতে হবে। কারণ সরকার আজ হোক আর কাল হোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবেই। তাই যদি এখন থেকে পড়ালেখার উপর থাকে তাহলে তখন মানসিকভাবে কোন বাধার সম্মুখিন হতে হবে না এবং পরীক্ষা নিয়েও টেনশনে থাকতে হবে না।

লেখক: শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মী

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।