শনিবার ১৭ এপ্রিল ২০২১ ৪ বৈশাখ ১৪২৮

বিপিসির রহস্যময় তৎপরতা
ভেস্তে যেতে পারে মাতারবাড়ী এলপিজি টার্মিনাল প্রকল্প
তিন কোম্পানির দুটি দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত, অন্যটি সম্পূর্ণ ভুয়া
জোনায়েদ মানসুর
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২ মার্চ, ২০২১, ১১:২০ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ভেস্তে যেতে পারে মাতারবাড়ী এলপিজি টার্মিনাল প্রকল্প

ভেস্তে যেতে পারে মাতারবাড়ী এলপিজি টার্মিনাল প্রকল্প

বেসরকারি উদ্যোগে মাতারবাড়ীর গভীর সমুদ্র বন্দরে একটি এলপিজি টার্মিনাল প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নানামুখী তৎপরতা সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও জাপান এবং বাংলাদেশ সরকারের গভীর আগ্রহ রয়েছে যত দ্রুত সম্ভব এ টার্মিনাল প্রতিষ্ঠার, কিন্তু বিপিসির নানামাত্রিক তৎপরতা এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তার জন্ম দিচ্ছে বলে মনে করছেন দেশের জ্বলানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০১৮ সালে জাপান সফরকালে এলপিজি টার্মিনাল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এবং একটি স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। জাপান একটি শর্তে এ প্রকল্পে সেদেশের অর্থায়ন সংস্থা জাইকার মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। এই শর্তটি হচ্ছে কোন জাপানি প্রতিষ্ঠানকে লিড পার্টনার করে একটি কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছর জাপানের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ মিৎসুই দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত এলপিজি কোম্পানি এসকে গ্যাসকে সঙ্গে নিয়ে একটি যৌথ বিনিয়োগ প্রস্তাব বিপিসির কাছে জমা দেয়।

বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগের সাথে একাধিক বৈঠকের পর যখন মিৎসুই-এসকে গ্যাস কনসোর্টিয়ামকে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তেই আরও দুটি জাপানি সংস্থা আলাদা আলাদা কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়ে প্রস্তাব পেশ করে। বিপিসি এ প্রস্তাবগুলোর সারমর্ম তুলে ধরে জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সেগুলো পাঠিয়ে দেয় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত প্রদানের জন্য। এই তিনটি প্রস্তাবের মধ্যে বাকি দুটি হচ্ছে জাপানের মারুবিনি এবং জিক্সিস কর্পোরেশনের। মারুবেনি ভিটল নামে একটি ইউরোপীয় গ্যাস ট্রেডিং কোম্পানি ও সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত বাংলাদেশের পাওয়ার কো নামের একটি কোম্পানির সাথে যৌথ প্রস্তাব পেশ করে। অন্যদিকে জিক্সিস নেদারল্যান্ডের এস এইচ ভি নামের একটি কোম্পানির সাথে যৌথ প্রস্তাব পেশ করে।

বিপিসি কর্তৃক জ্বালানী বিভাগের মাধ্যমে প্রাপ্ত এই প্রস্তাবগুলোর ওপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে বরং একটি কনসালটেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করে।

জ্বালানি বিভাগ এই নির্দেশনা পেয়ে বিপিসিকে নির্দেশ দেয় একটি কনসালটেন্ট নিয়োগের জন্য। এরপর থেকেই শুরু হয় বিপিসির রহস্যময় আচরণ। জ্বালানি বিভাগের নির্দেশনায় বলা হয়েছে জ্বালানি খাতের কোন সংস্থা কে দিয়ে এই কনসালটেন্ট নিয়োগ করার জন্য। কিন্তু বিপিসি কনসালটেন্ট নিয়োগের দায়িত্ব দেয় বিদ্যুৎ বিভাগের অধীন সংস্থা পাওয়ার সেলকে। অথচ জ্বালানি বিভাগের কোন সংস্থায় কনসালটেন্ট নিয়োগের জন্য পাওয়ার সেল কে দায়িত্ব দেওয়ার কোনো নজির নেই। কারণ পাওয়ার সেলের জ্বালানি বিভাগ সম্পর্কে তেমন কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। অবশ্য পাওয়ার্র সেল শেষ পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করে।

জ্বালানি বিভাগের অধীন কোন সংস্থার বদলে পাওয়ার সেলকে এজাতীয় কনসালটেন্ট নিয়োগের দায়িত্ব কেন প্রদান করা হলো তার কোনো ব্যাখ্যা বিপিসির কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। 

এদিকে বিপিসি তার রহস্যময় তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়, বিপিসি এবার কোন কনসালটেন্ট নিয়োগ না করে নিজেই প্রস্তাবগুলো নিজের মত করে মূল্যায়ন করে একটি নিজস্ব প্রস্তাব তৈরি করেছে। এই প্রস্তাবে মারুবেনি কে টার্মিনাল করার দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ মারুবেনির গভীর সমুদ্র বন্দরে এ জাতীয় এলপিজি টার্মিনাল করার কোন অভিজ্ঞতা নেই। এছাড়া বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়ে মারুবেনি দুর্নীতি করায় একবার জাইকা কর্তৃক কালো তালিকাভুক্তও হয়। অপরদিকে সম্প্রতি ব্রাজিলে দুর্নীতির দায়ে তার পার্টনার ভিটলকে ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জরিমানা গুনতে হয়েছে। পাশাপাশি এই কনসোর্টিয়ামের আরেক পার্টনার পাওয়ার কো সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত একটি কোম্পানি যার পরিশোধিত মূলধন মাত্র ১০০ ডলার। অর্থাৎ এ তিনটি কোম্পানির দুটি দুর্নীতির দায় সাজাপ্রাপ্ত এবং অন্যটি সম্পূর্ণ ভুয়া একটি কোম্পানি যার কোনো বিনিয়োগ অভিজ্ঞতাই নেই। শুধু বাংলাদেশে কাজ পাওয়ার উদ্দেশ্যে ১০০ ডলার পরিশোধিত মূলধন দেখিয়ে কোম্পানিটি নিবন্ধিত হয়েছে। অথচ বিবিসি এই তিনটি কোম্পানির কনসোর্টিয়ামকেই বেছে নিয়েছে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের অধিক এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য।

দেশের জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোন কারণে, এই কনসোর্টিয়াম কাজ পেলেও তাদের পক্ষে এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। কারণ এই কনসোর্টিয়ামের আমদানি করা এলপিজি কারা ক্রয় করবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। আর যতক্ষণ পর্যন্ত ক্রেতা নির্ধারিত না হবে এবং কোন স্থানীয় কোন সরবরাহকারী এলপিজি ক্রয়ের কোন নিশ্চয়তা না দেবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন ব্যাংক এই প্রকল্পের কোন কাজে অর্থায়ন করবে না। তাই অনেকেই মনে করছেন বিপিসির এই রহস্যময় তৎপরতার কারণে শেষ পর্যন্ত নির্মানাধীন মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরে এলপিজি টার্মিনাল প্রতিষ্ঠার প্রকল্পটি ভেস্তে যেতে পারে। এ বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের নিবিড় নজরদারি আশা করছেন তারা।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।