বুধবার ১৪ এপ্রিল ২০২১ ৩০ চৈত্র ১৪২৭

এক যুগেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক মামলা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১০:৫৭ এএম আপডেট: ২৫.০২.২০২১ ১১:০৪ এএম | অনলাইন সংস্করণ

এক যুগেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক মামলা

এক যুগেও শেষ হয়নি বিস্ফোরক মামলা

বিডিআর সদর দফতরে সেনা কর্মকর্তাদের নৃশংসভাবে হত্যাযজ্ঞের ১২ বছর পূর্তি আজ। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দফতরে বিপথগামী জওয়ানরা কিছু দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে তাণ্ডব চালায়। ওই দুদিনে তৎকালীন বিডিআরের মহাপরিচালকসহ (ডিজি) ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা এবং নারী ও শিশু ছাড়াও আরো ১৭ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে বিদ্রোহী জওয়ানরা। দীর্ঘ একযুগেও ওই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি নিহতদের স্বজনরা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জঘন্য ও বর্বরোচিত ওই পিলখানা হত্যা মামলার বিচার উচ্চ আদালতে চূড়ান্ত পর্যায়ে ডেথ রেফারেন্সে গেলেও বিস্ফোরক আইনের মামলা জজ আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আটকে আছে। দীর্ঘ ১২ বছরেও এ মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি।

মামলার পাবলিক প্রসিকিউশন মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, বিস্ফোরক আইনে করা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। এ পর্যন্ত ১৮৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরা হয়েছে। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রায় সাড়ে ১২০০ সাক্ষী রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৩০০ জন সাক্ষীর (গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর) সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে মামলাটি রায় হবে বলে আশা করছি।

বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে বিলম্ব হচ্ছে। করোনার কারণে আসামি এবং সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া প্রতি মাসে দুই দিন করে এই মামলার কার্যক্রম চলছে। তার দাবি, প্রচলিত নিয়মেই নিয়ম মতো মামলার কার্যক্রম চলছে।

এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির জনসংযোগ শাখা সূত্র জানিয়েছে, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রæয়ারি তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দফতর, পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে শহীদ ব্যক্তিবর্গের স্মরণে আজ ২৫ ফেব্রæয়ারি শাহাদাতবার্ষিকী পালিত হবে। দিনের কর্মসূচি অনুযায়ী শহীদ ব্যক্তিবর্গের রুহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে পিলখানাস্থ বিজিবি সদর দফতরসহ সকল রিজিয়ন, প্রতিষ্ঠান, সেক্টর ও ইউনিটের ব্যবস্থাপনায় খতমে কোরআন, বিজিবির সকল মসজিদ এবং বিওপি পর্যায়ে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় বনানী সামরিক কবরস্থানে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধানরা (সম্মিলিতভাবে), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব ও বিজিবি মহাপরিচালক (একত্রে) শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এছাড়া দিবসটি পালন উপলক্ষে বিজিবির সকল স্থাপনায় বিজিবি পতাকা অর্ধনমিত থাকবে ও বিজিবির সকল সদস্য কালোব্যাজ পরিধান করবে।

বিজিবি সূত্র জানায়, পরের দিন ২৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বাদ জুম্মা পিলখানার বিজিবি কেন্দ্রীয় মসজিদ, ঢাকা সেক্টর মসজিদ ও বর্ডার গার্ড হাসপাতাল মসজিদে শহীদ ব্যক্তিবর্গের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে বিজিবি কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও বিজিবি মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। শহীদ ব্যক্তিবর্গের নিকটাত্মীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোয়া ও মিলাদ মাহফিলে অংশ নেবেন।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার পিলখানায় ভয়ঙ্কর বিদ্রোহী জওয়ানদের হাতে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। রক্তাক্ত সেই বিদ্রোহে বেসামরিক ব্যক্তিসহ মোট ৭৪ জন প্রাণ হারান। ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে জওয়ানদের বিদ্রোহ। প্রতি বছর ২৫ ফেব্রæয়ারি পিলখানা ট্র্যাজেডি দিবস পালিত হয়।

বিডিআর বিদ্রোহের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দুই কমিটির প্রতিবেদনে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার বিচার সেনা আইনে করার সুপারিশ করা হলেও উচ্চ আদালতের মতামতের পর সরকার প্রচলিত আইনে এর বিচার করে। নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারকে আর্থিক সুবিধাও দেয়া হয়।

সূত্র জানায়, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় অধিনায়কদের সামারি ট্রায়ালে সবচেয়ে বেশি লোকের সাজা হয়। এতে ১১ হাজার ২৬৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৯৭৩ জনের বিভিন্ন ধরনের সাজা হয়। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে আট হাজার ৭৫৯ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। বাকিরা প্রশাসনিক দণ্ড শেষে আবার চাকরিতে যোগদান করেন।

দ্বিতীয় পর্যায়ে বিশেষ আদালত গঠন করে ছয় হাজার ৪৬ জন জওয়ানকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। এসব মামলায় পাঁচ হাজার ৯২৬ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। তাদের প্রত্যেককে চাকরিচ্যুত করা হয়। আর বেকসুর খালাসপ্রাপ্ত ১১৫ জন চাকরি ফিরে পান। বিচার চলার সময় পাঁচজনের মৃত্যু হয়।

জানা গেছে, সেই ভয়াবহ বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় দুটি ফৌজদারি মামলা করা হয়। এর একটি ছিল খুনের মামলা আর অন্যটি বিস্ফোরক মামলা। খুনের মামলায় ৮৫০ জনের বিচার ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকার জজ আদালতে শেষ হয়। এতে ১৫২ জনের ফাঁসি, ১৬০ জনের যাবজ্জীবন ও ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। আর ২৭৮ জন খালাস পান। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে হাইকোর্ট রায় দেন। এদিকে ফৌজদারি আদালতে দায়ের করা বিস্ফোরক মামলায় ৮৩৪ জন আসামি রয়েছে। এ মামলার দেড় শতাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষ হয়েছে।

হাইকোর্টে হত্যা মামলার সর্বশেষ অবস্থা : পিলখানায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদর দফতরে বিদ্রোহের ঘটনায় সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার দায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ডে রায় বহাল রাখেন হাইকোর্ট। এ মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির রায়ে ১৮৫ জনকে হাইকোর্ট যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তিন থেকে ১০ বছরের সাজা হয়েছে ২২৮ জনের। সব মিলিয়ে অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন মোট ২৮৮ জন। অভিযুক্ত ৮৪৬ জন আসামির মধ্যে বাকি ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।

২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চ সর্বসম্মত এ রায় দেন। হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সংখ্যার দিক দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ মামলায় হাইকোর্টের প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার রায় দুদিন ধরে ঘোষণা করা হয়।

কী ঘটেছিল সেই দুই দিন? ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালটা শুরু হয়েছিল আর দশটা দিনের মতোই। কিন্তু শেষ হয় রক্ত, লাশ আর বারুদের গন্ধে। মামলার নথি থেকে জানা যায়, বিডিআরের বার্ষিক দরবারের ওই অনুষ্ঠান শুরু হয় সকাল নয়টায় সদর দফতরের দরবার হলে। উপস্থিত ছিলেন মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, উপ-মহাপরিচালক (ডিডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ বারী, বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তারা। ওই দিন দরবারে উপস্থিত ছিলেন দুই হাজার ৫৬০ জন।

দরবার শুরুর পর ডিজির বক্তব্য চলাকালে মঞ্চের বাঁ-দিকের পেছন থেকে দুজন বিদ্রোহী জওয়ান অতর্কিতে মঞ্চে প্রবেশ করেন, একজন ছিলেন সশস্ত্র। শুরু হয় বিদ্রোহ। দরবার হলের বাইরে থেকে গুলির আওয়াজ ভেসে আসে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিদ্রোহীরা কর্মকর্তাদের দরবার হল থেকে সারিবদ্ধভাবে বের করে আনেন।

ডিজির নেতৃত্ব কর্মকর্তারা দরবার হলের বাইরে পা রাখা মাত্র মুখে কাপড় ও মাথায় হলুদ রঙের হেলমেট পরা চারজন ডিজিকে লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করেন। ডিজির পর হত্যা করা হয় আরো কয়েকজন কর্মকর্তাকে। এভাবে দুই দিন ধরে চলতে থাকে নারকীয় হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ। ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ‘বিডিআর’ এর নাম পরিবর্তন করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) করা হয়।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।