বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১২ ফাল্গুন ১৪২৭

কিশোর অপরাধী সন্তান নিয়ে বিপাকে বাবা-মা
ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২০, ৫:১৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম

কোনো শিশুই অপরাধী হিসেবে জন্মায় না। বরং সে নিষ্পাপ হয়ে জন্মায়। পরিবেশ, পরিস্থিতি, পারিপার্শ্বিকতা, সামাজিক ব্যবস্থা, পিতা-মাতার আচরণ, অপসংস্কৃতি, সন্তানদের প্রতি পিতা-মাতার স্নেহ ও তদারকির অভাব, অপূরণীয় আকাক্সক্ষা, দুঃখ-দারিদ্র্য, অবিচার, খারাপ ব্যবহার ইত্যাদি অনেক কারণে তার মধ্যে অপরাধ প্রবণতা দেখা দেয়। শিশুর অপরাধী হওয়ার মূল কারণ তার মধ্যেই নিহিত থাকে। অর্থাৎ অপরাধী হওয়ার প্রাথমিক কারণগুলো শৈশবেই সৃষ্টি হয়। অজ্ঞানতার কারণে কিংবা সজ্ঞানে এই অপরাধ প্রবণতা শিশুদের মধ্যে বেড়েই চলে। একপর্যায়ে সে অপরাধী হয়ে ওঠে। শিশু অপরাধীরা সাধারণত প্রাথমিক অপরাধী। ২০১৩ সালের শিশু আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী অনূর্ধ্ব ১৮ বয়স পর্যন্ত ব্যক্তি শিশু হিসেবে গণ্য হবে।

শিশু কর্তৃক সংঘটিত অপরাধের খবর মাঝে মাঝে পত্রিকায় আসে। এসব খবর পড়ে আমাদের পিতৃ-মাতৃসুলভ মন হতাশ হয়ে যায়। বিভিন্ন সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, পারিপার্শ্বিক এবং পারিবারিক কারণে শিশুরা অপরাধ করে থাকে। 

শিশু অপরাধের ক্ষেত্রে ধার্য্য বয়সসীমা নির্ভর করে সে দেশের আইনের ওপর। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৮২ ধারা অনুযায়ী ৭ বছরের ঊর্ধ্বে এবং ১২ বছরের নিচে যে কোনো শিশুর কাজকে অপরাধ বলে বিবেচনা করা যাবে না, যদি সে বিশেষ কোনো সময় বা পরিস্থিতিতে তার কৃতকর্মের প্রকৃতি বা ফলাফল সম্পর্কে বুঝা বা বিচার করার ক্ষমতা অর্জন করে। জাতিসংঘ ঘোষিত শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচের বয়সের সবাই শিশু হিসেবে বিবেচিত হবে এবং শিশুর সকল অধিকার পাবে। বাংলাদেশ জাতীয় শিশু নীতি অনুযায়ী ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে-মেয়েরা শিশু হিসেবে গণ্য হবে। কোনো কোনো অপরাধ বিজ্ঞানীর মতে, পাঁচ বছর পযর্ন্ত অপরাধীরা শিশু অপরাধী। এ বয়সি ছেলে-মেয়ে কর্তৃক সংঘটিত আইন বিরুদ্ধ কোনো কাজ কিশোর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এদের বিচার একমাত্র কিশোর আদালতে হবে এবং এরা শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনের সুযোগ পাবে।

স্কুল পলাতক বালকদের অপরাধী হতে দেখা গেছে। বারে বারে ঘটলে বুঝতে হবে ওই বালক শিগগিরই কিশোর অপরাধী হবে। অনেক ক্ষেত্রে শুধু রোমান্স ও তামাশা উপভোগ করার জন্য কিশোররা অপরাধ করে থাকে। অনেক সময় নৈরাস্য থেকে আক্রমণি স্বভাবের উদ্ভব হয় যা কিশোর অপরাধী হওয়ায় ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। নিগৃহ, নিপীড়ন, অবজ্ঞা, অবহেলা কিশোর অপরাধী হওয়ার অন্যতম কারণ। কিশোর অপরাধী সৃষ্টির জন্য অনেক সময় অভিভাবক ও পিতা-মাতাকে দায়ী করা হয়ে থাকে। তবে অধিকাংশ সময় কিশোর বয়সে উপনীত হওয়ার পর বালকরা কিশোর অপরাধী হয়। 

শিশু-কিশোররা ছোটবেলায় যা দেখবে তাই শিখবে। সন্তান যদি পিতা-মাতাকে সবসময় খিটখিটে মেজাজে দেখে তবে তার মধ্যেও বড় হলে এ ধরনের আচরণ গড়ে উঠবে। সন্তানরা এই খিটখিটে মেজাজের জন্য অপরাধবোধে ভোগে। অবহেলিত উদ্বাস্তু সমাজ এবং ভাঙা সংসার কিশোর অপরাধী সৃষ্টির সহায়ক। বিবাহ বিচ্ছেদ, মাতা-পিতার পৃথক অবস্থান, পরিত্যক্ত স্বামী-স্ত্রী, মাতা-পিতার পৃথক সংসার ও বসবাস কিশোর অপরাধী সৃষ্টির অন্যতম কারণ। মাতা-পিতার পুনর্বিবাহ বেশিরভাগ শিশুই পছন্দ করে না। ঘরভাঙা সংসারে শিশুদের ভালো থাকা কঠিন। কিশোররা সাধারণত অপরাধী পিতার অনুগামী হয়ে থাকে। অবৈধ সন্তানেরা বা পিতৃনামহীন সন্তানরা প্রায়ই নিজেদেরকে ঘৃনিত মনে করে অপরাধী হয়ে ওঠে। শিশুদের বিস্ময়, ক্রোধ, উত্তেজনা, আগ্রহ বা নির্লিপ্ততা, ভাবুকতা, প্রতিকার স্পৃহা ইত্যাদি লক্ষ্য রাখতে হবে। দারিদ্র্যের মতো প্রাচুর্যও ক্ষতিকর। প্রাচুর্য মানুষকে অলস করে। এই অবস্থায় তারা অপরাধমুখী হয়।

শিশু অপরাধীর বিচার শিশু আদালতেই হবে এবং এরা শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনের সুযোগ পাবে। শিশু আইন অনুযায়ী দেশের অপরাধপ্রবণ ও উচ্ছৃঙ্খল শিশুদের দোষ ত্রুটিগুলো সংশোধনের সুযোগ দিলে তারা আগামী দিনে সম্ভাবনাময়, চরিত্রবান ও উৎপাদনশীল সুনাগরিক গড়ে উঠবে। আর এটাই দেশবাসীর একান্তভাবে কাম্য এবং প্রত্যাশা। তাই শিশু অপরাধীর বিচারে শাস্তির পরিবর্তে সংশোধনই লক্ষ্য।

কোনো শিশুকে মৃত্যুদণ্ড,যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা কারাদণ্ড প্রদান করা যাবে না। তবে কোনো শিশুকে যদি কোনো মারাত্মক ধরনের অপরাধ সংঘটন করতে দেখা যায়,তাহলে শিশু আদালত প্রয়োজন মনে করলে শিশুকে কারাদণ্ড প্রদান করে কারাগারে প্রেরণের জন্য আদেশ দিতে পারেন। তবে উক্তরূপ কারাদণ্ডে থাকাকালীন যে কোনো সময়ে শিশু আদালত উপযুক্ত মনে করলে কারাগারে আটক রাখার পরিবর্তে অভিযুক্ত শিশুকে তার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রত্যায়িত প্রতিষ্ঠানে আটক রাখতে পারেন।

কোনো শিশু মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় কোনো অপরাধে দোষী প্রমানিত হলে শিশু আদালত তাকে অনূর্ধ্ব ১০ বছর এবং অন্যুন ৩ বছর মেয়াদে আটকাদেশ প্রদান করে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আটক রাখার জন্য আদেশ প্রদান করতে পারেন। তবে কোনো শিশু মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় নয়, এমন কোনো অপরাধ প্রমানিত হলে শিশু আদালত তাকে অনধিক ৩ বছর মেয়াদে আটকাদেশ প্রদান করে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আটক রাখার জন্য আদেশ প্রদান করতে পারেন।

সমাজে শিশুরা যাতে অপরাধবোধে উৎসাহিত হয়ে অপরাধী হিসেবে গড়ে না ওঠে সেদিকে প্রত্যেকের নজর দেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে পরিবারের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের সর্বস্তরের বিশেষ করে শিক্ষক,সমাজকর্মী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সবাইকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ আজকের শিশু ও কিশোররাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার নৈতিক দায়িত্ব প্রত্যেকের ওপর বর্তায়।

লেখক : সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, জাতিসংঘ ও আইজি পদকপ্রাপ্ত।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।