বুধবার ১৪ এপ্রিল ২০২১ ৩০ চৈত্র ১৪২৭

পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিল
রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২০, ৯:৪৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিল । সংগৃহীত ছবি

পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিল । সংগৃহীত ছবি

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুত্থানের মাহেন্দ্রক্ষণ ১৬ ডিসেম্বর। এদিন বাঙালি জাতি রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটার দিন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন দেশ ও লাল সবুজের পতাকা। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টা ৪১ মিনিটে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যায় পূর্ব পাকিস্তানের নাম। আনুষ্ঠানিকভাবে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।
  
এদিন আত্মসমর্পণের আগে ও পরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মূল দুশ্চিন্তা ছিল নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে। তারা শঙ্কিত ছিল, নয় মাসের গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের কারণে ক্রুদ্ধ মুক্তিবাহিনী আর বাংলার স্বাধীনতাকামী মানুষ তাদের ওপর চরম প্রতিশোধ নিতে পারে। এ বিষয়টি নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন ছিল জেনারেল নিয়াজি ও তার দোসররা।

ঢাকা সেনানিবাসে পাকিস্তানি ইস্টার্ন কমান্ডের হেডকোয়ার্টারে মিত্রবাহিনীর মেজর জেনারেল জ্যাকব আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়াজির মধ্যে আত্মসমর্পণ চুক্তি নিয়ে ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে যখন দরকষাকষি চলে, তখন পাকিস্তানি বাহিনীর নিরাপত্তার প্রসঙ্গটিই ছিল আলোচনার অন্যতম মূখ্য বিষয়। ঢাকায় তখন প্রায় ৩০ হাজার পাকিস্তানি স্বশস্ত্র সেনা সদস্য আর নানা রকম আধাসামরিক বাহিনীর লোকজন মিলিয়ে প্রায় ৯৪ হাজার সদস্য আটকা পড়েছিল। ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব তার ‘স্যারেন্ডার অ্যাট ঢাকা: বার্থ অব অ্যা নেশন’ বইয়ে লিখেছেন, পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ না করে সেনানিবাসে তার সদর দপ্তরেই আত্মসমর্পণের ব্যাপারে চাপাচাপি করছিলেন। সেটা যে কেবল জনসমক্ষে অবমাননা এড়ানোর জন্যই, তা নয়। এর পেছনে নিজেদের পিঠ বাঁচানোর চিন্তাও কাজ করেছিল তাদের মনে। তারা ভীতসন্ত্রস্তও ছিল। 

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এই ভীতি যে খুব অমূলক ছিল, তাও নয়। কাদের সিদ্দিকী (বীরউত্তম) তার ‘স্বাধীনতা ’৭১’ বইয়ে লিখেছেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আর জেনারেল নিয়াজিকে বহনকারী গাড়ি যখন লাখ লাখ জনতার ভিড় ঠেলে ঢাকা সেনানিবাস থেকে রেসকোর্স ময়দানের দিকে এগোচ্ছিল, তখন একাধিকবার সেই বহরের গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। ক্ষিপ্ত ক্রুদ্ধ জনতা নিয়াজিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বার বার। তারা বলছিল, ‘নিয়াজিকে আমাদের হাতে দাও। ও খুনি। ও আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ মেরেছে, বাড়িঘর পুড়িয়েছে, আমরা ওর বিচার করব।’ জেনারেল জ্যাকব লিখেছেন, আত্মসমর্পণ নিয়ে আলোচনায় সাব্যস্ত হয়, ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরিত হলেও নিয়াজি ও তার বাহিনী তখনই অস্ত্র সমর্পণ করবে না। জেনারেল জ্যাকব শুধুমাত্র নিরাপত্তার প্রশ্নে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাদের অস্ত্র রাখার অনুমতি দেন। ফলে পাকিস্তানি বাহিনী যুদ্ধবন্দি হলেও ঢাকা সেনানিবাসে তাদের অবস্থান ছিল সশস্ত্র। এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি।

পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের তিন দিন পর ১৯ ডিসেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের গলফ মাঠে অস্ত্র সমর্পণ করে পাকিস্তানি বাহিনীর ৩০ হাজার সৈন্য। তাদের পক্ষে  (পাকিস্তান সেনাবাহিনী) নেতৃত্ব দেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। আর মিত্রবাহিনীর পক্ষে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল সগৎ সিং অস্ত্র গ্রহণ করেন।

পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক পার্থ সেনগুপ্ত ছিলেন এই অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানে। পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকায় ছাপা হওয়া প্রতিবেদনে ১৯ ডিসেম্বরের ডেট লাইনে তিনি লিখেছেন, ‘অফিসারস হুঁশিয়ার! হাতিয়ার বাহার জমিন! পাকিস্তানি স্থলবাহিনীর মেজর জেনারেল জামসেদ কম্যান্ড দেবার সঙ্গে আজ বেলা ১০টা ৪৫ মিনিটে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের গলফ মাঠে সবুজ ঘাসের ওপর ৪৭৮ জন পাকিস্তানি অফিসার তাদের অস্ত্রগুলি সাজিয়ে রাখলেন। তারপর এক পা পিছিয়ে গিয়ে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়ালেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কয়েকজন অফিসার গিয়ে অস্ত্রগুলি কুড়িয়ে নিলেন। নানান ধরনের অস্ত্র, পিস্তল, রিভলবার, এলএমজি, স্টেনগান। এভাবে পর্যায়ক্রমে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা তাদের অস্ত্র সমার্পন করেন।’

পার্থ সেনগুপ্ত আরও লেখেন, ‘ডিসেম্বরের সূর্যের দিকে মুখ করে ম্রিয়মাণ বিষণ্নমুখে ক্যান্টনমেন্টের দিকে তাকিয়েছিলেন পাকবাহিনীর দীর্ঘতম লে. জেনারেল রাও ফরমান আলি। ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যান্টনমেন্টের বিভিন্ন ইউনিট লাইনে তার বাহিনীর ৩০ হাজার পরাজিত সৈন্য নিজেদের হাতিয়ার তুলে দিচ্ছে। আজ থেকে বাংলাদেশে প্রায় এক লক্ষ পাক সৈন্য ভারতের যুদ্ধবন্দি।’ অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানে রাও ফরমান আলি বিমর্ষ থাকলেও তার সৈন্যরা মনে মনে খুশিই ছিলেন। কারণ অস্ত্র সমর্পণ মানে এখন তারা জেনেভা কনভেনশনের আওতায় এলেন। বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ভয় দূর হয়েছে। জেনারেল নিয়াজি এই অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানে ছিলেন না। নিরাপত্তার জন্য আগের দিন তাকে হেলিকপ্টারে করে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।’

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের প্রেক্ষাপট ও দলিল: পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিলে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সময় বিকাল ৪.৩১ মিনিটে ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি সই করেন। পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিল তিন প্রস্থে প্রস্তুত করা হয়েছিল। একটি প্রস্থ ভারত সরকার এবং দ্বিতীয় প্রস্থ পাকিস্তান সরকারের নিকট সংরক্ষিত আছে ও তৃতীয় প্রস্থ ঢাকার শাহবাগ জাদুঘরে আছে।

যে টেবিলে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছিল তা ঢাকা ক্লাব থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। এই টেবিলটি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের ৩৭ সংখ্যক প্রদর্শনী কক্ষে সংরক্ষিত আছে।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যা শুরু করে। অতঃপর জনযুদ্ধের আদলে মুক্তিযুদ্ধ তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা ঘটে। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে পড়ে যে উপায়ন্তর না দেখে ঘটনা ভিন্ন খাতে পরিচালিত করতে তারা ডিসেম্বরের ৩ তারিখ ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, ‘বাংলাদেশে যে যুদ্ধ চলে আসছিল তা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।’ ভারতের সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সাথে যুক্ত হয়ে যৌথবাহিনী তৈরি করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ভারতীয় স্থলবাহিনীর সম্মুখ অভিযান শুরু হয় চারটি অঞ্চল থেকে: (১) পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে তিন ডিভিশনের সমবায়ে গঠিত ৪র্থ কোর সিলেট-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা-নোয়াখালী অভিমুখে; (২) উত্তরাঞ্চল থেকে দুই ডিভিশনের সমবায়ে গঠিত ৩৩তম কোর রংপুর-দিনাজপুর-বগুড়া অভিমুখে; (৩) পশ্চিমাঞ্চল থেকে দুই ডিভিশনের সমবায়ে গঠিত ২য় কোর যশোর-খুলনা-কুষ্টিয়া-ফরিদপুর অভিমুখে; এবং (৪) মেঘালয় রাজ্যের তুরা থেকে ডিভিশন অপেক্ষা কম আর একটি বাহিনী জামালপুর-ময়মনসিংহ অভিমুখে।
 
যৌথবাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে সারাদেশের সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রগুলো থেকে পাকিস্তানিরা পিছু হটতে শুরু করে। একের পর এক পাকিস্তানি ঘাঁটির পতন হতে থাকে। পাকিস্তানিরা অল্প কিছু জায়গায় তাদের সামরিক শক্তি জড় করেছিল; যৌথবাহিনী তাদের এড়িয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ঢাকার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। বাংলাদেশের আপামর জনতাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে। আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় মুক্তি ও মিত্র যৌথবাহিনী ঢাকার দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণের মুখে ইতোমধ্যে পর্যদুস্ত ও হতোদ্যম পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। 

১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান প্রায় ৯৪ হাজার সৈন্যসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। স্বাক্ষরিত হয় আত্মসমর্পণের দলিল। এরই মাধ্যমে নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের অবসান হয়; প্রতিষ্ঠিত হয় বাঙালি জাতির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান:
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি, ভারতীয় ও বাংলাদেশি বাহিনীর যুগ্ম কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপ-সেনাপ্রধান, এয়ার কমোডর এ কে খন্দকার আত্মসমর্পণে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানি নৌ-পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কমান্ডার রিয়ার-অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরিফ এবং পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় বিমান বাহিনীর কমান্ডার এয়ার ভাইস-মার্শাল প্যাট্রিক ডেসমন্ড কালাঘান, যারা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষে, গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার আত্মসমর্পণের সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ভারতের পক্ষে, ভারতীয় ৪র্থ কোরের কমান্ডার লে. জেনারেল সগৎ সিং, পূর্বাঞ্চলীয় বিমান বাহিনীর কমান্ডার এয়ার মার্শাল হরি চাঁদ দেওয়ান, ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সেনা প্রধান মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত ছিলেন।

আত্মসমর্পণ দলিলের ভাষ্য: আত্মসমর্পণ দলিলের লেখা এখন বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারত সরকারের পাবলিক সম্পত্তি এবং এটি দিল্লি জাতীয় জাদুঘর প্রদর্শনের জন্য রাখা আছে (জানুয়ারি ২০১২ হিসাবে)। দলিলের লেখা ইংরেজিতে ছিল এবং তা হলো:

The PAKISTAN Eastern Command agree to surrender all PAKISTAN Armed Forces in BANGLA DESH to Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA, General Officer Commanding in Chief of Indian and BANGLA DESH forces in the Eastern Theater. This surrender includes all PAKISTAN land, air and naval forces as also all para-military forces and civil armed forces. These forces will lay down their arms and surrender at the places where they are currently located to the nearest regular troops under the command of Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA.

The PAKISTAN Eastern Command shall come under the orders of Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA as soon as the instrument has been signed. Disobedience of orders will be regarded as a breach of the surrender terms and will be dealt with in accordance with the accepted laws and usages of war. The decision of Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA will be final, should any doubt arise as to the meaning of interpretation of the surrender terms.

Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA gives a solemn assurance that personel who surrender shall be treated with dignity and respect that soldiers are entitled to in accordance with provisions of the GENEVA Convention and guarantees the safety and well-being of all PAKISTAN military and para-military forces who surrender. Protection will be provided to foreign nationals, ethnic minorities and personnel of WEST PAKISTANI origin by the forces under the command of Lieutenant-General JAGJIT SINGH AURORA.
<signed> <signed>

(JAGJIT SINGH AURORA)
Lieutenant-General
General Officer Commanding in Chief
India and BANGLA DESH Forces in the
Eastern Theatre
16 December 1971
(AMIR ABDULLAH KHAN NIAZI)
Lieutenant-General
Martial Law Administrator Zone B and
Commander Eastern Command
(Pakistan)
16 December 1971

অনুবাদ
পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ, লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানের সব সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণে সম্মত হলো। পাকিস্তানের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ সব আধা-সামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে এই আত্মসমর্পণ প্রযোজ্য হবে। এই বাহিনীগুলো যে যেখানে আছে, সেখান থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কর্তৃত্বাধীন নিয়মিত সবচেয়ে নিকটস্থ সেনাদের কাছে অস্ত্রসমর্পণ ও আত্মসমর্পণ করবে।

এই দলিল স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড লেফটেন্যান্ট-জেনারেল অরোরার নির্দেশের অধীন হবে। নির্দেশ না মানলে তা আত্মসমর্পণের শর্তের লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে এবং তার প্রেক্ষিতে যুদ্ধের স্বীকৃত আইন ও রীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আত্মসমর্পণের শর্তাবলীর অর্থ অথবা ব্যাখ্যা নিয়ে কোনো সংশয় দেখা দিলে, লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।

লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণকারী সেনাদের জেনেভা কনভেনশনের বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান দেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করছেন এবং আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সামরিক ও আধা-সামরিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও সুবিধার অঙ্গীকার করছেন। লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধীন বাহিনীগুলোর মাধ্যমে বিদেশি নাগরিক, সংখ্যালঘু জাতিসত্তা ও জন্মসূত্রে পশ্চিম পাকিস্তানি ব্যক্তিদের সুরক্ষাও দেওয়া হবে।

পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কেন ওসমানী ছিলেন না: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, নয় মাস যুদ্ধের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। সেদিন বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটের দিকে ঢাকায় রমনা রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি। মিত্রবাহিনীর পক্ষে দলিলে সই করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। তার অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র সে সময় নানা রকম বিতর্ক হয়। যদিও প্রটোকলের কারণে ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে।

১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল বাংলাদেশের সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভাষণে মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে মুক্তিবাহিনী ও  বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে ঘোষণা দেন। ওসমানী সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ২৬ ডিসেম্বর ওসমানীকে সেনাবাহিনীর জেনারেল পদমর্যাদা (অক্রিয়) প্রদান করা হয়।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল ওসমানী কেন উপস্থিত ছিলেন না, এমন প্রশ্নের জবাবে মেজর জেনারেল (অব.) কে এম শফিউল্লাহ বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর আমি ছিলাম ঢাকার ডেমরা এলাকায়। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেনারেল অরোরা। যদিও থাকার কথা ছিল ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশ'র। ওসমানী ছিলেন বাংলাদেশের প্রধান সেনাপতি। তবে জেনারেল ওসমানী আগে কোনো এক সময় বক্তব্যে বলেছিলেন, “ভারতীয় সেনাপ্রধান যদি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকেন, তাহলে বাংলাদেশের উপসেনা প্রধান থাকবেন।’ কারণ, এটা প্রটোকলের প্রশ্ন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে একে খন্দকার উপস্থিত ছিলেন। আমিও ছিলাম। তারা যখন আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন, তখন আমি টেবিলের সামনে দাঁড়ানো ছিলাম।’’

কে এম শফিউল্লাহ বলেন, ‘এ ছাড়া, সেদিন জেনারেল ওসমানী সিলেট সীমান্তের দিকে যাচ্ছিলেন। তাকে বহনকারী হেলিকপ্টার শক্রুপক্ষের গুলিতে বিধ্বস্ত হয়। ওই ঘটনায় লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুর রব সাহেব গুলিবিদ্ধ হন।’

মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অধীনে মুক্তিবাহিনীর সদরদপ্তরে তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন নজরুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পরবর্তীতে ‘একাত্তরের রণাঙ্গন অকথিত কিছু কথা’ নামে একটি বই লিখেছেন তিনি। অনুপম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই বইয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কেন এমএজি ওসমানী ছিলেন না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বইটির ২৪১ পৃষ্ঠায় নজরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্ব শেষ হওয়ার দুই দিন পর জেনারেল ওসমানী বিক্ষুব্ধ-উত্তপ্ত মুজিবনগর সরকারের সদরদপ্তরে ফিরে আসেন। ঢাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তার অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে এক অনাকাক্সিক্ষত ক্ষোভ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টির হয়, যা মুজিবনগর সরকারের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের এই অতিগুরুত্বপূর্ণ সময়ে মুজিবনগরে জেনারেল ওসমানীর  অনুপস্থিতিতে স্বাধীন বাংলা সরকারের নেতারাও তার ওপরে কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলা সরকারের সদরদপ্তরে পা রেখে জেনারেল ওসমানী উত্তাপ কিছুটা টের পেয়েছিলেন।’

‘... জেনারেল ওসমানীর এডিসি সবিস্তারে জেনারেল সাহেবের অনুপস্থিতিতে তাকে ঘিরে কে কী মন্তব্য করেছেন, সব কথা তাকে রিপোর্ট করেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও অবহিত হওয়ার জন্য জেনারেল সাহেব আমাকে তার কক্ষে ডাকেন। খুব ধীরস্থির হয়ে বসে জেনারেল ওসমানীকে জানালাম, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আপনার অনুপস্থিতি নিয়ে এখানে রাজনৈতিক মহলে বিরূপ সমালোচনা হয়েছে।’

নজরুল ইসলাম আরও লিখেছেন, ‘জেনারেল ওসমানী কিছুটা কর্কশ কণ্ঠে বললেন, ‘দেখুন, আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে যাচ্ছি। কিন্তু দুঃখ হলো স্বাধীন জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ সম্পর্কে কোনো চেতনা এখনো জন্ম হয়নি। আমাকে নিয়ে রিউমার ছড়ানোর সুযোগটা কোথায়? কোনো সুযোগ নেই। তার অনেক কারণ রয়েছে। নাম্বার ওয়ান- পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কবে আত্মসমর্পণ করবে, আমি জানতাম না। আমি কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাদের আত্মসমর্পণের প্রস্তাব এসেছে।’

জেনারেল ওসমানী বলেন, ‘নাম্বার টু- ঢাকায় আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমার যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ, এই সশস্ত্র যুদ্ধ ভারত-বাংলাদেশের যৌথ কমান্ডের অধীনে হলেও যুদ্ধের অপারেটিং পার্টের পুরো কমান্ডে ছিলেন ভারতীয় সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল শ্যাম মানেকশ। সত্যি কথা আমি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো নিয়মিত সেনাবাহিনীর সেনাপ্রধানও নই। আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে না। কারণ, বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী কোনো দেশ নয়। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল মানেকশকে রিপ্রেজেন্ট করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা। জেনারেল মানেকশ গেলে তার সঙ্গে আমার যাওয়ার প্রশ্ন উঠত। সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে আমার অবস্থান জেনারেল মানেকশের সমান। সেখানে জেনারেল মানেকশের অধীন আঞ্চলিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল অরোরার সফরসঙ্গী আমি হতে পারি না। এটা দেমাগের কথা নয়, এটা প্রটোকলের ব্যাপার।

জেনারেল ওসমানী বলেন, ‘যুদ্ধ-বিগ্রহ, জয়-পরাজয়, আত্মসমর্পণ সম্পর্কে জেনেভা কনভেনশনের আন্তর্জাতিক নীতিমালা আছে। জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো যুদ্ধ-বিগ্রহ, জয়-পরাজয়, আত্মসমর্পণ  ইত্যাদির ব্যাপারে এ নীতিমালা মানতে বাধ্য। আমরা মানে বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ নই। এই কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হবে না। কারণ, তাদের (পাকবাহিনী) ধারণা, আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে আমরা তাদের সঙ্গে জেনেভা কনভেনশনে  বর্ণিত নীতিমালা অনুযায়ী আচরণ করব না। যেহেতু আমরা জেনেভা কনভেনশনের আওতায় পড়ি না, তাই জেনেভা কনভেনশনের নীতিমালা মানতে আমরা বাধ্যও নই। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা তাদের হত্যা করে ফেলবে। কিন্তু জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী পরাজিত আত্মসমর্পণকারী সৈন্যদের হত্যা করা বা কোনো রূপ নির্যাতন করা যায় না। তাদের নিরাপত্তায় আইনি প্রটেকশন দিতে হয়। সামরিক রীতিনীতি অনুযায়ী তাদের সঙ্গে আচরণ করতে হয়। উন্নত খাবার, নানান সুযোগ-সুবিধা দিতে হয়। বন্দিকালীন সময়ে নিরস্ত্র অবস্থায় এক্সারসাইজ, খেলাধুলা ইত্যাদির সুযোগ-সুবিধা দিতে হয়। কিন্তু আমরা তো এখনও ভারতের মাটিতেই রয়ে গেছি। বাংলাদেশই তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। আমাদের সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কোনো নিয়মিত সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী নেই। এমনকি পুলিশ বাহিনীও নেই। এ অবস্থায় ৯০ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করলে, আমরা তাদের রাখব কোথায়? তাদের প্রটেকশন দেব কিভাবে? ৯০ হাজার সৈন্যকে তিন বেলা উন্নত খাবার দেব কোথা থেকে।’

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।