বৃহস্পতিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১২ ফাল্গুন ১৪২৭

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশিত ৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ থেমে আছে
অনিশ্চয়তার ফাঁদে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প
হরলাল রায় সাগর
প্রকাশ: রোববার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০, ৯:২৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

অনিশ্চয়তার ফাঁদে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প

অনিশ্চয়তার ফাঁদে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশিত তিন হাজার কোটি টাকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের কাজ থেমে আছে। নানা বিতর্ক ও প্রতিবন্ধকতার কারণে মেয়াদের প্রায় পাঁচ মাস চলে গেলেও কোনো প্রকার কর্মকাণ্ড শুরু হয়নি। একটি সুবিধাভোগী চক্রের ফাঁদে পড়ে কৃষি খাতের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি এখন অনিশ্চয়তায় হাবুডুবু খাচ্ছে। বঁটি-ড্রামকাণ্ডের পর বিধি বহির্ভূতভাবে ও বিতর্কিত কর্মকর্তাকে পিডি নিয়োগ দিয়ে গ্যাঁড়াকলে পড়েছে কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসরাণ অধিদপ্তর। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
একের পর এক প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত কাজের কারণে বেকায়দায় পড়েছেন কৃষিমন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন সুবিধাবাদী কর্মকর্তার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও ক্ষুব্ধ। কৃষিমন্ত্রীও তোপের মুখে পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে।  

কৃষিবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ অগ্রাধিকার ভিত্তিক তিন হাজার বিশ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ’ প্রকল্পটি গত ১৪ জুলাই অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পের ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) ২০০ লিটারের পানির প্লাস্টিকের একটি ড্রাম ও সবজি কাটার একটি বঁটির দাম ধরা হয় ১০ হাজার টাকা করে। এক কেজি ধারণক্ষমতার একটি মসলাপাত্রের দাম দুই হাজার টাকা, একটি অ্যালুমিনিয়ামের চামচের দাম এক হাজার টাকাসহ এরকম বিভিন্ন জিনিসের দাম অস্বাভাবিক ধরা হয়। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে শুরু হয় তোলপাড়। এরপর আগস্টে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তদন্তে অস্বাভাবিক দরপ্রস্তাব ও প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগের শর্তাবলির অসামঞ্জস্যের প্রমাণ মেলে। পরবর্তীতে ডিপিপি সংশোধনেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই মধ্যে নানা নাটকীয়তার পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অতিরিক্ত পরিচালক ও প্রেষণে নিযুক্ত ‘কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটসমূহের (এটিআই) কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’র পিডি মো. বেনজীর আলমকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের পিডি নিয়োগ দেওয়া হয়। পিডি নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে দেখা গেছে, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে গত ১৪ অক্টোবর পিডি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে। এতে সাক্ষর রয়েছে মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (সম্প্রসারণ শাখা-১) মো. মশিউর রহমানের। তবে নিয়ম থাকলেও এই প্রজ্ঞাপন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়নি। একেবারেই গোপন রাখা হয়েছে। অবশ্য নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তার আইডিসহ ফেসবুকে ভাইরাল হয় প্রজ্ঞাপনটি।

জানা গেছে, এই প্রজ্ঞাপনে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সদ্য বিদায়ী সচিব মো. নাসিরুজ্জামানের সই বা অনুমোদন নেই। তিনি ১৫ অক্টোবর অবসরকালীন ছুটিতে (পিআরএল) যান। নিয়ম-বিধির মধ্যে না পড়ায় বেনজির আলমকে পিডি হিসেবে নিয়োগ দিতে আপত্তি করেন সচিব। বিষয়টি তিনি দাফতরিকভাবে পত্রের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কয়েক দফা ডেকে নিয়ে কৈফিত তলব করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, এটিআইসমূহের কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ প্রল্পের পিডি বেনজীর আলম ডিএইর অতিরিক্তি পরিচালক পদ মর্যাদার কর্মকর্তা। এই পদটি সরকারের টাইম স্কেলের তৃতীয় গ্রেডের পদ। আর পিডি পদটি দুই ধাপ নিচের পঞ্চম গ্রেডের। সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ডিপিপিতেও (ডিএই’র মূল ডিপিপিতে পিডি ও ডিপিডির যোগ্যতায় বিসিএস কৃষি ক্যাডার কর্মকর্তা অথবা বিসিএস কৃষি প্রকৌশলী উল্লেখ ছিল। অবৈধভাবে এটি পরিবর্তন করা হয়।) পিডির পদ পঞ্চম গ্রেড ও ডিএই থেকে প্রেষণে নিয়োগের কথা বলা হয়েছে এবং তাকে হতে হবে বিসিএস কৃষি প্রকৌশলী। প্রকল্পের কাজে থাকতে হবে কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা। কিন্তু কৃষিবিদ বেনজীর আলমের প্রকল্পের কাজে এই অভিজ্ঞতা নেই।
 
২০১৬ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জারি করা নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬ মাস পর্যন্ত যেসব কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ থাকবে না, তাদের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পে পিডি নিয়োগে এ বিষয়টিও চরমভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। বেনজীর আলমের জন্ম ১৯৬৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এ হিসেবে তার চকরি জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে ২০২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর। অর্থাৎ তার চাকরির বয়স আছে দুই বছর এক মাস। এছাড়া জ্যেষ্ঠতার কারণে আগামী ৪-৫ মাসের মধ্যে পরিচালক পদ মর্যাদায় তার পদোন্নতি পাওয়ার কথা রয়েছে। সরকারী বিধি অনুসারে কখনই পরিচালক পদের কোনো কর্মকর্তা কোনো অবস্থায়ই পিডি থাকতে পারবেন না। তাহলে কীসের স্বার্থে নীতিমালা ও বিধি-বিধানের জলাঞ্জলি দিয়ে অল্প সময়ের জন্য দুর্নীতিপরায়ন কর্মকর্তা বেনজীর আলমকে পিডি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে-এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের মাঝে।

এছাড়া প্রায় চার মাস পরে ২২ নভেম্বর এই প্রকল্পে ডিপিডি (উপ প্রকল্প পরিচালক) হিসেবে ডিএইর উপপরিচালক আলতাফুন নাহার ও শফিকুল ইসলাম শেখকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে বিলুপ্ত খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের ডিপিডি থাকাকালে শফিকুলে বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নতুন কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের বিতর্কিত ডিপিপি প্রণয়নে প্রধান সহযোগী ছিলেন।        

সূত্র জানায়, প্রকল্পের কার্যক্রমের শুরুতেই কেনাকাটা ও জনবল নিয়োগের বিষয়টি থাকে। একে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় আর্থিক ফায়দা লোটার সুযোগ। ডিপিপি সংশোধন না করেই প্রকল্প পাস হওয়ার তিন মাস পর পিডি নিয়োগ দেওয়া হলো। মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে একটি প্রভাবশালী কৃষিবিদ মহলের তদবিরে বিতর্কিত ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত বেনজীর আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। মহলটির স্বার্থে এবং ভিন্ন উদ্দেশ্যে তাকে পিডি বানানোর বিষয়টি খামারবাড়িতে ওপেন সিক্রেট।  নিয়োগ পাওয়ার পর উল্লাস ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন বেনজীর আলম।

অভিযোগ রয়েছে, এটিআইসমূহের কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির। ডিপিপি অনুয়ায়ী গত জুনে নির্ধারিত কাজ শেষ করতে পারেননি পিডি বেনজীর আলম। যে কাজ সম্পন্ন হয়েছে তাও নিম্নমানের এবং সন্তোষজনক নয়। বাঞ্ছারামপুর, খুলনা, সাটুরিয়া, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন এটিআইতে কাজের মান খুবই খারাপ। দুই ফুটের পরিবর্তে বসানো হয়েছে এক ফুটের টাইলস। দরপত্রের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী টাইলস লাগানো ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়নি। এমনকি কাজ অসম্পূর্ণ থাকলেও জুনে সম্পূর্ণ বিল দিয়ে দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারদের। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের জুনে। ১১৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ের তিন বছর মেয়াদী এই প্রকল্পের দুই বছর অতিক্রান্ত হলেও সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩২ শতাংশ। বাকী সময়ে কোনো অবস্থায়ই প্রকল্পের বাকি কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। যথাসময়ে কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রকল্পটি রিভিশন করে আরও এক বছর বাড়ানোর নির্দেশনা রয়েছে পরিকল্পনা বিভাগের। এবিষয়ে কোনো পদক্ষেপ বা প্রক্রিয়া এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। বিষয়টি গত ১৯ অক্টোবর ডিএইতে অনুষ্ঠিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিবি) সভায়ও আলোচিত হয়েছে। বেনজীর আলমের দক্ষতা ও প্রকল্পের কাজে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডিএইর তৎকালীন মহাপরিচালক। এই অবস্থায় বেনজীর আলম ও শফিকুল ইসলামের মত অদক্ষ ও দুর্নীতিপরায়ন কর্মকর্তাদের মেগাপ্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়ায় হতবাক সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পটির যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন কৃষিবিদরা।  

পাঁচ বছর মেয়াদি এই মেগাপ্রকল্প শেষ হবে ২৪ সালের জুনে। ইতিমধ্যে ৫ মাস চলে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। ডিপিপিও সংশোধন করা হয়নি। জানা গেছে, প্রকল্পে শুধু একজন হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর কোনো জনবল নিয়োগ দিতে পারেননি পিডি। তবে বোরো মৌসুম সমাগত হওয়ায় কয়েকশ যন্ত্র কেনার তাগিদ দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর কোনো আয়োজন নেই। এদিকে বেনজির আলমকে নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় দুর্নীতিতে অভিযুক্ত, যে কর্মকর্তার তৈরি ডিপিপির কারণে প্রকল্পটি প্রশ্নবিদ্ধ হয় সেই কর্মকর্তা শেখ নাজিম উদ্দিন ওই প্রকেল্পর পিডি হওয়ার জন্য আবার দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছেন। সংশ্লিষ্টদের কাছে ধর্ন দিয়ে তিনি কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইছেন এবং পিডি হওয়ার তদবির করছেন বলে খামারবাড়ি সূত্রে জানা গেছে। বিলুপ্ত খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি থাকাকালে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, যা তদন্ত করছে দুদক। সূত্র জানায়, শেখ নাজিম ওই প্রকল্পের ১০ বছর পিডি ছিলেন। এক বছর আগে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও শেখ নাজিম এখনো প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করছেন। আর ডিপিপি তৈরির দোসর তার সহযোগী সাবেক ডিপিডি শফিকুল ইসলাম শেখ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিকল্পনা ও মনিটরিং উইংয়ের ডেস্ক অফিসার কৃষি অর্থনীতিবিদ রেহানা সুলতানা।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।