বুধবার ২৭ জানুয়ারি ২০২১ ১৩ মাঘ ১৪২৭

ভয় নেই মৃত্যুদণ্ডে, বাড়ছে ধর্ষণ
হরলাল রায় সাগর
প্রকাশ: শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২০, ৩:৫০ পিএম আপডেট: ২৮.১১.২০২০ ৩:৫৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

আইন সংশোধন করে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ১৪ অক্টবর থেকে। কিন্তু এই সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করা হলেও ধর্ষণ কমছে না, বরং বেড়েছে। আবার বেড়েছে সংঘবদ্ধ ধর্ষণেরও ঘটনা। নতুন সাজা কার্যকরের দিন থেকে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত এক মাস ১০ দিনে ১৯১ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই ভুক্তভোগীদের ৪৬ জনই শিকার হয়েছেন দলবদ্ধ ধর্ষণের। এ সময় অর্ধশতাধিক নারী ও শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। আগের মাস সেপ্টেম্বরের তুলনায় এই ঘটনা দ্বিগুণেরও বেশি। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ঘটনা সমন্বয় করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। অপর একটি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে ধর্ষণ বেড়েছে চারগুণেরও বেশি, যার পরিমাণ ৩৭৪টি। প্রতিদিনই সারাদেশে ঘটছে এমন ঘটনা।

মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, কঠোর আইন ধর্ষণ প্রতিরোধে সহায়ক হচ্ছে না। কারণ যারা এ অপরাধ করছে, তারা ধর্ষণকে অপরাধ বলেই মনে করে না। সচেতনতা বাড়ালে এবং শাস্তি কার্যকর করা গেলে এর প্রভাব পড়বে। এর জন্য সামাজিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক ওয়েবিনারে জরুরি ভিত্তিতে ভার্চুয়াল কোর্ট অর্ডিন্যান্স যেন কোনও বাধা ছাড়াই কাজ করতে পারে এজন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন ও বাল্যবিয়ে বন্ধে বড় প্রচারণা চালানোর সুপারিশ করেন বিশেষজ্ঞরা। 

একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদের ভিত্তিতে তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন ১৪ অক্টোবর থেকে ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত এক মাস ১০ দিনে ১৯১ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এই ভুক্তভোগীদের ৪৬ জনই শিকার হয়েছেন দলবদ্ধ ধর্ষণের। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল ও গাজীপুরে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রায় আড়াইশ জনকে আসামি এবং ১৮২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আসামিরা প্রতিবেশী, আত্মীয়, প্রেমিক ও স্কুল-মাদরাসার শিক্ষক। এর বাইরে অপরিচিত ব্যক্তিদের কাছে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮ জন। মুদি দোকানি, সেলুনের কর্মী, ইজি বাইকের চালক, বাসচালক, চালকের সহকারী, রিকশাচালক, কবিরাজ, সবজি বিক্রেতা, ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, পুলিশ সদস্য, বিজিবি সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মীর কাছেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি এই ধর্ষণে নারীরাও সহযোগিতা করছে। এই সহায়তাকারী হিসেবে কমপক্ষে তিনজন নারীর বিরুদ্ধে এ সময় অভিযোগ উঠেছে।

তবে উল্লেখ করার মতো হলো- ধর্ষণের মত এই জঘন্যতম অপরাধে শিশু-কিশোররাও জড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিককালে এই প্রবণতা বেড়েছে। বাকেরগঞ্জের শিশুদের হাতে শিশু নিগৃহিত হওয়ার ঘটনাটা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক ও মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক সুশিক্ষার অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা শিক্ষার অভাব, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনা, তথ্যপ্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব এর জন্য দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।  

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের (জানুয়ারি- সেপ্টেম্বর) ৯ মাসে ৯৭৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাই ২০৮টি। সংস্থাটির তথ্যমতে, আইন কঠোর হওয়ার পরও বেড়েছে ধর্ষণ। সেপ্টেম্বরে ধর্ষণের এি ঘটনা ছিল ৮৬টি। আর অক্টোবরে বেড়ে হয়েছে ৩৭৪। এই সংখ্যা আগস্টে ছিল ১৪৮। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় অক্টোবরে ৮৫টি ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়। 

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এক হাজার ৮৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৭৭ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫০ জনকে এবং আত্মহত্যা করেছেন ধর্ষণের শিকার ২৯ জন। এ ছাড়া করোনাকালে অর্থাৎ এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলায় ৩৭ হাজার ৯১২ জন নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এরমধ্যে ১৬ হাজার ৪৮৫ জন প্রথমবারের মতো এই সহিংসতার শিকার হন। সহিংসতার শিকারদের মধ্যে মানসিক নির্যাতন করা হয়েছে ১৭ হাজার ৫৫৭ জনকে, অর্থনৈতিক নির্যাতন চলেছে ১১ হাজার ৮৪১ জনের ওপর, শারীরিক নিপীড়নের শিকার সাত হাজার ৫৬২ জন এবং যৌন হয়রানির শিকার ৯৫২ জন নারী। তবে শিশুরা অধিকাংশই তাদের বাবা, মা ও পরিবারের অন্যদের হাতেই পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। একই সময়ে বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে ৯৩৫টি শিশু। 

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক আব্দুল কাইউম বলেন, ‘ধর্ষণ হওয়ার আগেই নিপীড়নের ঘটনায়ও যেন দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আগের আইনগুলোও আছে। আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমেই পুলিশ পারে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে। প্রয়োজন আইনের বাস্তবায়ন। হত্যার শাস্তিও মৃত্যুদণ্ড, এ কারণে হত্যা বন্ধ হয়নি। তবে হত্যা করলে ফাঁসি হবে, ভয় পায় মানুষ। তদন্ত আর বিচারে সাজা নিশ্চিত করতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন্স অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বলেন, ‘ধর্ষক বা লাঞ্ছনাকারীদের আমরা উল্লাস করতে দেখি। নারীদের নির্যাতন অপরাধ নয়, এই জঘন্য মানসিকতা গড়ে উঠেছে অনেকের মধ্যে। মূলত বিচারহীনতা এবং ক্ষমতার প্রভাব এটি করছে। এটি হচ্ছে পরিবার থেকে সমাজ, রাষ্ট্রে সবখানে। একদল আদিম মানসিকতাতেই দেখছে নারীদের। তাদের চিহ্নিত করতে হবে। যেহেতু তাদের সেই বোধ নেই, সেহেতু শক্ত বা দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ভয় দেখাতে হবে তাদের। ’
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘এখনো যারা ধর্ষণ করে যাচ্ছে, তাদের মৃত্যুদণ্ড হলো কি হলো না তার খবর নেই। এখানে জনসচেতনতা বাড়ানোর কাজ করতে হবে। অনেকে নারীকে নির্যাতন করা অপরাধই মনে করে না। কারণ এর জন্য তেমন শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় না। যুবসমাজকে উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে।’ 

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন নাসিমা বেগম বলেন, নারী-শিশুর প্রতি সব ধরনের সহিংসতারোধে নির্যাতন সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন সংস্থাকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে নারীদেরও শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। এজন্য সমাজের বিভিন্ন সেক্টরকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী শাহীন আনাম বলেন, দেশব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতা যেমন বাড়ছে, তেমনি সামাজিক আন্দোলনও কিন্তু বাড়ছে। সেই সঙ্গে আছে নাগরিক সমাজ, সরকার ও তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের বিভিন্ন কার্যক্রম। যেসব সংস্থা নারীর প্রতি সহিংসতা রোধকল্পে কাজ করছে, যেমন- স্বাস্থ্যসেবা, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থাকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে স্বচ্ছতার সঙ্গে।

সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে এক নববধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও ভিডিও ফেসবুকে প্রচারের ঘটনায় গোটা দেশে আন্দোলণের ঝড় ওঠে। দুই সপ্তাহের বিক্ষোভের মধ্যে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে সরকার। যা গত ১৪ অক্টোবর কার্যকর হয়।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।