বুধবার ২৭ জানুয়ারি ২০২১ ১৩ মাঘ ১৪২৭

৪৫ লাখ টিনধারীর মধ্যে রিটার্ন দেন মাত্র ২০ লাখ
কর দেন মাত্র এক শতাংশ মানুষ
জোনায়েদ মানসুর
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২০, ৯:২৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

কর দেন মাত্র এক শতাংশ মানুষ

কর দেন মাত্র এক শতাংশ মানুষ

দেশ সব সূচকেই এগিয়ে চলছে। অর্থনীতির দিক দিয়ে এ সূচক আরও দ্রুতগতিতে চলছে। বাড়ছে অর্থনীতির আকারও। যে হারে অর্থনীতির আকার বাড়ছে, সেই হারে রাজস্ব আদায় করতে পারছে না, পাশাপাশি নতুন করদাতার সূচকেও পিছিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। দীর্ঘদিন ধরেই করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে কর ব্যবস্থায় কোনো সংস্কার না হওয়ায় করের আওতাও বাড়াতে পারছে না এনবিআর। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করের আওতা বাড়াতে হলে, কর আদায়ে তিন ক্ষেত্রে সংস্কার জরুরি বলছেন তারা। 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, কর আদায় ও করের আওতা বাড়াতে হলে জনগণের ভোগান্তি কমাতে হবে। পাশাপাশি করনীতি, কর প্রশাসন ও অটোমেশন সেক্টরে সংস্কার জরুরি বলেছেন তিনি। আহসান এইচ মনসুর বলেন, মাত্র ১ শতাংশ মানুষ আয়কর দেন। এটা কোনোভাবেই বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে যায় না।’ 

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) আছে প্রায় ৪৫ লাখ। কিন্তু বছর শেষে আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন জমা দেন প্রায় ২০ লাখ। তাদের মধ্যে ৭ থেকে ৮ লাখ আবার সরকারি কর্মকর্তা। প্রতি মাসে বেতন-ভাতা প্রদানের সময়ই ‘পে-রোল ট্যাক্স’ কেটে রাখা হয়। অন্যদিকে যারা বছর শেষে রিটার্ন জমা দেন, তাদের প্রায় ১০ শতাংশ শূন্য রিটার্ন জমা দেন। অর্থাৎ এই ১০ শতাংশ করের আওতায় পড়েন না। সেই হিসাবে দেশে আয়কর দেন এক শতাংশেরও কম মানুষ।

বিশ্বব্যাংকের হিসেবে জিডিপির তুলনায় কর আহরণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তলানিতে আছে। আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম। অর্থাৎ জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশে সবচেয়ে কম নাগরিক আয়কর দেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে কর না দিয়ে পার পাওয়াটা খুব সহজ বলেই এমনটা হচ্ছে। আবার সরকারি সেবা কম পাওয়ার অজুহাতেও কর দেওয়া থেকে বিরত থাকেন অনেকে। এ কারণে করদাতার পেছনে না ছুটে সরকারের নজর শুল্ক ও ভ্যাট আদায়ের দিকেই বেশি। এতে ধনীরা কর ফাঁকি দিলেও দরিদ্রদের কাছ থেকে ঠিকই আদায় হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশের জিডিপি পৌনে ৯ শতাংশেরও কম আসে কর থেকে। অথচ নেপালে জিডিপির মোট ২১ শতাংশের মতো কর থেকে আসে। যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম কর-জিডিপি অনুপাত আফগানিস্তানে। ওই দেশে জিডিপির অনুপাতে সাড়ে ৭ শতাংশের মতো কর আসে। তারপরেই আছে বাংলাদেশ। তবে সরকারি হিসাব বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এদিকে ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের (টিজেএন) তথ্য বলছে মুনাফা ও সম্পদ স্থানান্তর করে বাংলাদেশ থেকে বছরে ৫ হাজার ৯৮০ কোটি টাকার কর ফাঁকি দিচ্ছে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি ও ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা। টিজেএন মূলত কর ফাঁকিবিরোধী একটি আন্তর্জাতিক ফোরাম। গত শুক্রবার বিশ্বব্যাপী কর ন্যায্যতা নিয়ে ‘দ্য স্টেট অব ট্যাক্স জাস্টিস-২০২০: ট্যাক্স জাস্টিস ইন দ্য টাইম অব কোভিড-১৯’ নামের যে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, বছরে কর ফাঁকির পরিমাণ মোট কর রাজস্বের ৩.৪৬ শতাংশ। যা স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়ের ৬১.৮৯ শতাংশ ও শিক্ষা খাতে ব্যয়ের ১৪ শতাংশের সমান। টিজেএন বলছে, কর ফাঁকির টাকা শুধু বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে তা নয়, কর ফাঁকি দিতে অন্যান্য দেশ থেকে বাংলাদেশেও অর্থ এসেছে। অন্য দেশ বাংলাদেশের কারণে বছরে কর হারাচ্ছে ৮ লাখ ৮৮ হাজার ডলার বা প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা।

এদিকে মহামারি করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আহরণেও। এ কারণে এখনও রাজস্ব আদায় স্বাভাবিক পর্যায়ে আসেনি। তা ছাড়া করদাতারাও যথাযথ কর দিচ্ছেন না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনার কারণে মানুষের আয় কমে গেছে, যার কারণে আয়কর খাত থেকে সরকারের আয়ও কমে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী,  করোনায় মানুষের আয় কমেছে ২০ শতাংশ। বিবিএস বলছে, করোনার আগে গত মার্চ মাসে প্রতি পরিবারের মাসিক গড় আয় ছিল ১৯ হাজার ৪২৫ টাকা। আগস্টে কমে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৪৯২ টাকায়। অর্থাৎ পাঁচ মাসের ব্যবধানে পরিবারপ্রতি আয় কমেছে প্রায় চার হাজার টাকা।

জানা গেছে, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৪৭৫ কোটি এবং আমদানি শুল্ক থেকে ৯৫ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের মূল বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে আদায় হয় ২ লাখ ১৮ হাজার ৪০৬ কোটি ৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছিল।
সরকারের আয় কমেছে : আয় কমে যাওয়ার কারণে দেশের মানুষ গত বছরের মতো এবারও সরকারকে কর দিচ্ছে না। একইভাবে ব্যবসা করে গত বছরের মতো তারা সরকারকে ভ্যাটও দিচ্ছে না। তবে আমদানি ও রফতানি খাত থেকে সরকার ভালো রাজস্ব পাচ্ছে। এনবিআরের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের (জুলাই-আগস্ট) তুলনায় এই অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আমদানি ও রফতানি খাতে সরকারের আয় বেশি হয়েছে, যার পরিমাণ ৪৩৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

এনবিআরের তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের জুলাই ও আগস্ট এই দুই মাসে আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে সরকারের আয় হয়েছিল ৮ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা। এই বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে সরকার এ খাত থেকে তার চেয়ে ১০৫ কোটি টাকা কম রাজস্ব আহরণ করেছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সরকার আয়কর ও ভ্রমণ কর থেকে রাজস্ব আহরণ করেছে ৮ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। এনবিআরের তথ্যমতে, গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের তুলনায় এই বছরের প্রথম দুই মাসে স্থানীয় পর্যায়ে মূসক বা ভ্যাট থেকে আদায় কমেছে ২৮০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এনবিআরের হিসাবে, এই অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভ্যাট থেকে আদায় হয়েছে ১১ হাজার ৩৫১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আর গত বছরের একই সময়ে ভ্যাট থেকে আদায় হয়েছিল ১১ হাজার ৬৩২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। 

এনবিআরের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের তুলনায় এই অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আমদানি ও রফতানি খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বেশি হয়েছে, যার পরিমাণ ৪৩৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এনবিআরের গবেষণা প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান অনুবিভাগের তথ্য বলছে, এই বছরের জুলাই ও আগস্ট দুই মাস শেষে আমদানি ও রফতানি পর্যায়ে সরকারের আয় হয়েছে ১০ হাজার ৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৯ হাজার ৫৭২ কোটি ৮২ লাখ টাকা।  আমদানি ও রফতানি পর্যায়ে আয় বাড়ার কারণে আগস্টে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি গত দুই বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের (২০১৯ সালের) আগস্টে রাজস্ব আয়ের কোনো প্রবৃদ্ধিই ছিল না। উল্টো আগের বছরের (২০১৮ সালের) তুলনায় প্রবৃদ্ধি কমেছিল ৫ শতাংশ। আর ২০১৮ সালের আগস্টে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল মাত্র ২ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এনবিআরের হিসাবে, গত আগস্ট মাসে ১৫ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে এনবিআর, যা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে কোনো আগস্ট মাসের চেয়ে বেশি। গত বছরের আগস্টে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১৪ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের আগস্টে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১৪ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা। আর ২০১৭ সালের আগস্টে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১৪ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালের আগস্টে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১২ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। 

ইএফডিতে ভ্যাট দিলে পুরস্কার : ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইসের (ইএফডি) মাধ্যমে যারা ভ্যাট দেবেন, আগামী জানুয়ারি থেকে তাদের ইনভয়েস লটারি করা হবে। আর সেই লটারির মাধ্যমে কয়েকজনকে পুরস্কৃত করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম নিজেই এ ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফার্স হোটেলে ঢাকা দক্ষিণ কাস্টমস এক্সইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট আয়োজিত ইএফডি ও এসডিজি ব্যবহার এবং উপকারিতা সম্পর্কে অবহিতকরণ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণে এক সেমিনার ও আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।