শুক্রবার ২২ জানুয়ারি ২০২১ ৮ মাঘ ১৪২৭

নির্মমভাবে পুলিশ হত্যা মানা যায় না
ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২০, ৩:৪১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম।

ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম।

মানুষের নিরাপত্তায় যিনি ছিলেন তিনিই পেলেন না নিরাপত্তা। বরং তাকে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হলো। এ ধরনের একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে রাজধানী ঢাকার আদাবরে অবস্থিত মাইন্ড এইড হাসপাতালে। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ৯ নভেম্বর সোমবার সাড়ে ১১টার দিকে আদাবর মাইন্ড এইড হাসপাতালে মানসিক চিকিৎসা নিতে যাওয়া সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিম শিপনকে হাসপাতালের কর্মচারীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে নিহতের পরিবার অভিযোগ করেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, মানসিকভাবে অসুস্থ সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিমকে টেনেহিঁচড়ে ও ধস্তাধস্তি করে একটি কক্ষে নিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালের ৬ জন কর্মচারী। দ্বিতীয়তলার ওই কক্ষে নেওয়ার পর তাকে জোরপূর্বক মেঝেতে উপুড় করে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরা হয়। এ সময় আরও দুজন কর্মচারী সেখানে প্রবেশ করে। ধস্তাধস্তির সময় তাকে মারধরও করা হয়। একজন কনুই দিয়ে তার ঘাড়ে আঘাত করে। দুজন কর্মচারী তার পা চেপে ধরে। একজন তার হাত বেঁধে ফেলে। আনিসুল করিমের মাথার দিকে থাকা দু’জন তাকে কনুই দিয়ে আঘাত করে। ৪ মিনিট পর আনিসুল করিমকে যখন উপুড় করা হয় তখন তার শরীর নিস্তেজ ছিল। অর্থাৎ তিনি তখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। যারা তাকে মারধর করছে তাদের মধ্যে ওয়ার্ড বয় ছিল ৪ জন, ২ জন সমন্বয়কারী আর কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ঘটনার সময় কোনো চিকিৎসক না থাকলেও হাসপাতালের ব্যবস্থাপক উপস্থিত ছিলেন।

আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএস-এর কর্মকর্তা হিসেবে পুলিশে যোগদান করেন। সর্বশেষ তিনি বরিশাল মহানগর পুলিশে কর্মরত ছিলেন। তিনি জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৩৩তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। তার বাড়ি গাজীপুর জেলার কাপাসিয়ায়। তিনি এক সন্তানের জনক। পারিবারিক সমস্যার কারণে তিনি মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি ছিলেন সদালাপী, পরোপকারী, ভদ্র এবং মার্জিত। তার মৃত্যুতে তার কর্মস্থল ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, মানসিকভাবে অসুস্থ রোগীকে মারধর সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং বেআইনি বরং তার প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। কোনোভাবেই তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ বলছে, এটি কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা নয় বরং ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ঘটনার সাথে জড়িত ১০ জন আসামিকে পুলিশ গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করেছে। 

পত্রপত্রিকায় প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো হত্যার খবর ছাপা হয়। হত্যা শব্দটির মধ্যে ভয়ভীতি, আতঙ্ক, হতাশা, নিষ্ঠুরতা, হৃদয়হীনতা, উন্মাদনা, পৈশাচিকতা, বর্বরতা, অমানবিকতা, ক্ষোভ, প্রতিশোধের স্পৃহা, অন্যায় লাভ, ঘৃণা, দুঃখ, বেদনা, আফসোস ইত্যাদি সবই জড়িয়ে আছে। হত্যা ঘৃণিত, নিন্দনীয়, শাস্তিযোগ্য এবং মোটেই কাম্য নয়। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ৩০০ ধারানুসারে যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কোনো ব্যক্তির দেহে আঘাত বা জখম করে মৃত্যু ঘটায় তখন তাকে হত্যা বা খুন বলা হয়। অর্থাৎ হত্যা বলতে বোঝায়, যদি কোনো ব্যক্তি অপর কোনো ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃতভাবে, ব্যক্তিগত আক্রোশবশত কিংবা কোনো হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য পূর্ব পরিকল্পিতভাবে আঘাত বা জখম করে মৃত্যু ঘটায়। বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩০২ ধারাঅনুযায়ী হত্যাকারী বিচার সাপেক্ষে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। হত্যায় অভিযুক্ত যে কোনো ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা যাবে এবং এটি অজামিনযোগ্য অপরাধ। 

ইসলাম ধর্ম অনুসারে হযরত আদম (আ.)-এর পুত্র কাবিল তার ভাই হাবিলকে হত্যা করেন। এটাই পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম হত্যা। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অন্যায়ভাবে যে ব্যক্তিই নিহত হয় তার খুনের একটি দায় আদম (আ.) এর পুত্র কাবিলের ঘাড়ে চাপে। কারন সেই-ই প্রথম হত্যার রেওয়াজ প্রবর্তন করে।’ কিয়ামতের দিন এমনটি ঘটবে যে, নিহত ব্যক্তি হত্যাকারীর নিকট ক্ষতিপূরণ দাবি করবে। কিন্তু হত্যাকারীর নেক আমলসমূহ তা পূরণ করতে পারবে না। ফলে নিহত ব্যক্তির পাপকর্ম হত্যাকারীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে।

পবিত্র কোরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন- যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুসলমানকে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হন, তাকে অভিশাপ দেন এবং তার জন্য ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন (সূরা আন নিসা, আয়াত : ৯৩)। 

আল্লাহপাক কোরআনুল কারিমে আরও এরশাদ করেন, ‘তোমরা একে অন্যকে হত্যা করো না’ (সূরা নিসা, আয়াত : ২৯)। ‘যে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে সে গোটা মানবজাতিকে হত্যা করে’ (সূরা আল মায়্যিদা, আয়াত : ৩২)।’  ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত- রাসূল (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম খুনের বিচার করা হবে (মুসলিম : ১৭৩৪)। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) নবী করিম (সা.) থেকে বর্ণনা করেনÑ তিনি বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি তার হত্যাকারীর চুলের মুঠো ও মাথা ধরে আল্লাহর দরবারে এমন অবস্হায় হাজির হবে যে, তখন তার রগগুলো থেকে রক্ত পড়তে থাকবে। সে ফরিয়াদ করে বলবে, হে আমার প্রভু, এই ব্যক্তিই আমাকে হত্যা করেছে। এই বলতে বলতে সে আরশের নিকটবর্তী হয়ে যাবে (তিরমিজি : ২৩৭৮)। রাসূল (সা.) আরও বলেন, সে আমার উম্মত নয়, যে আমার অন্য উম্মতকে অবৈধভাবে হত্যা করে (আবু দাউদ : ১৯২১)। রাসূল (সা.) আরও এরশাদ করেন- সে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে এসে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে বলবে যে, সে আমার হত্যাকারী, আমি তার বিচার চাই (মুসলিম :২৩৬৭)। 

১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় দিন। ওইদিন পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে নিরস্ত্র জনতার ওপর ব্রিটিশ সেনাবাহিনী গুলি চালায়। ফলে ৪০০ লোক নিহত হয়। এই হত্যাযজ্ঞ ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলাদেশে যে গণহত্যা চালিয়েছে তা ইতিহাসে তাদের বর্বরতা, নির্মমতা এবং নিষ্ঠুরতার পরিচয় বহন করে।

হত্যা হত্যাই। হত্যা কোনো সমাধান নয় বরং শত্রুতা বাড়ায়। হত্যা আইনত দণ্ডনীয়। কোনো ধর্মেই হত্যা সমর্থনযোগ্য নয়। ইসলাম ধর্মে হত্যাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। হত্যা দুঃখ এবং ঘৃণা বয়ে আনে। দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারহীনতা হত্যাকে উৎসাহিত করে। আইনের মাধ্যমে হত্যাকারীর হত্যা সবারই কাম্য। দ্রুততম সময়ের মধ্যে হত্যার বিচার ক্ষতিগ্রস্তদের বিচার পাওয়ায় ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ন্যায় বিচারের পথকে অবশ্যই প্রশস্ত করে। হত্যাকারী শাস্তি পেলে হত্যা অবশ্যই কমবে এবং এটা ভুক্তভোগীসহ সবারই কাম্য। পুলিশের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আনিসুল করিমসহ প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত আসামিদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক : সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, আইজি ও জাতিসংঘ পদকপ্রাপ্ত

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।