শনিবার ২৮ নভেম্বর ২০২০ ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

দলীয় নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব কোন্দল প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে
উপ-নির্বাচনকে ঘিরে নড়বড়ে বিএনপির চেইন অব কমান্ড
কেউ কাউকে মানছে না, সংঘর্ষ মারামারি চলছে প্রতিদিন
এম উমর ফারুক
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২০, ১১:৪১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

উপ-নির্বাচনকে ঘিরে নড়বড়ে বিএনপির চেইন অব কমান্ড

উপ-নির্বাচনকে ঘিরে নড়বড়ে বিএনপির চেইন অব কমান্ড

করোনার মধ্যে দলীয় কর্মকাণ্ড শুরু করতেই অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড। শূন্য হওয়া পাঁচটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনকে ঘিরে দলীয় নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব কোন্দল প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে। কেউ কাউকে মানছেন না, গুরুত্বও দিচ্ছেন না। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত একই অবস্থা। দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন কিংবা দলীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নেও সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সবমিলে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে বিএনপির চেইন অব কমান্ড। বিশেষ করে ঢাকা-১৮ আসনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে বিএনপি তালগোল পাকিয়ে ফেলে। গুলশান অফিসে মারামারি সমাধান না করেই মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়। মনোনয়ন বঞ্চিতদের অনুসারীদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে দলীয় মহাসচিবের বাসায় ডিম ছুড়ে মারার মধ্য দিয়ে। এ নিয়ে দল থেকে দুই দফায় ১৮ জনকে বহিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া সদ্যসমাপ্ত ঢাকা-৫ আসনে উপনির্বাচনে কোন্দল জিয়ে রেখেই মনোনয়ন দেওয়া হয়।

ফলে নেতাকর্মীদের একটি অংশ নির্বাচনে মাঠেই নামেনি। নির্বাচনে কোনো ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি বিএনপি। এ আসনে ধানের শীষের ভরাডুবি হয়। এ জন্য দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে দায় করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, নবীউল্লাহ নবী গত নির্বাচনে এ আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু সদ্যসমাপ্ত উপনির্বাচনে তার সঙ্গে কোনো সমঝোতা না করেই সালাহউদ্দিনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। যার প্রভাব শুরু থেকেই পড়ে। নবীউল্লাহ নবীর অনুসারীরা নির্বাচনে মাঠে নামেননি। এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয়ভাবে গঠিত কমিটিরও তেমন কোনো ভূমিকায় দেখা যায়নি। দুই-একটা পথসভায় যোগ দিয়ে দলের সিনিয়র নেতারা দায় সেরেছেন। এ আসনে বাপ- বেটাই মাঠে ছিলেন। নিজেদের চেষ্টায় প্রতিরোধ গড়ারও চেষ্টা করেছেন। যা নির্বাচনের জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-১৮ আসনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে দলের স্থায়ী কমিটির নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। নির্বাচন সমন্বয় কমিটিতেও কোনো স্থায়ী নেতার নাম দেখা যায়নি। এই আসনের প্রার্থিতা নিয়ে শুরু থেকেই জটিলতায় ছিল বিএনপি। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকারের দিন বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দু’পক্ষের হামলার ঘটনায় দলের ১৭ জন নেতাকর্মী আহত হন। সেই সময় সাতজন মনোনয়ন প্রত্যাশী এসএম জাহাঙ্গীরকে দোষারোপ করে লিখিত অভিযোগ দেন দলটির কাছে। সেই ঘটনায় কাউকে শাস্তি না দিয়ে প্রার্থী ঘোষণা করায় বিক্ষুব্ধরা দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাসায় ডিম ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় মহানগর উত্তর বিএনপির ১৮ জন নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে দলটি। এতে আরও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ওই আসনের নেতাকর্মীরা। বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার না করলে দলের প্রার্থীকেও প্রতিরোধ করবেন বলে ঘোষণা দেন তারা। এর অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে এসএম জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ঝাড়ু মিছিল, কুশপুত্তলিকা দাহ, কালো পতাকা প্রদর্শন, জাহাঙ্গীরের পক্ষের ছয় নেতার বাসায় ডিম হামলা করেন বিক্ষুব্ধরা। এছাড়া আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আরও কঠিন কর্মসূচি পালন করবেন বলে বহিষ্কৃত নেতারা জানিয়েছেন।

এদিকে, জাতীয় কিংবা দলীয় বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচি এখন আর বাস্তবায়ন হয় না। সারা দেশে কর্মসূচিতে জেলায় নামকাওয়াস্তে কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়। বাকি জেলাগুলোতে কেন হয় না তার জবাবদিহিতাও নেওয়া হয় না। ঢাকা মহানগরেও একই অবস্থা। থানায় থানায় কোনো কর্মসূচি ডাকলেও তা বাস্তবায়ন হয় খুব কমই। এ নিয়েও কোনো জবাবহিদিতা নেই। কেন্দ্র বা মহানগরে দায়িত্বশীল নেতাদের নির্দেশনা মানতেও চান না মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

সূত্র জানায়, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও নেওয়া হয় না। কোথা থেকে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা স্থায়ী কমিটির সদস্যরাও জানেন না। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে একটি ফাইল দেওয়া হয়। ওই ফাইল নিয়ে আসা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। বিএনপি স্থায়ী কমিটি থেকে শুরু করে ভাইস চেয়ারম্যান, যুগ্ম মহাসচিব এমনকি ঢাউস নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যেও অন্তর্কোন্দল রয়েছে। কেউ কাউকে মানতেই চান না। জেলা-থানা পর্যায়ের নেতাদের মধ্যেও বিরোধ স্পষ্ট। যেসব জেলায় আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়েছে, সেখানেও বিএনপি দ্বিধাবিভক্ত। এ নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।দলের সভা-সমাবেশেও সিনিয়র নেতারা পাত্তা পান না জুনিয়রদের কাছে। দাঁড়ানো-বসা নিয়েও প্রায় সময় বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়। বিভিন্ন সময় দলের প্রভাবশালী নেতাদের হস্তক্ষেপ করতে দেখা যায়।

এদিকে, সিনিয়র তিন ভাইস চেয়ারম্যান দল ও দলীয় চেয়ারপারসন এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। দল থেকে এজন্য পাল্টা কোনো ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া তারেক রহমানের নেতৃত্ব নিয়েও তারা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দুর্নীতি মামলায় কারাগারে পাঠানোর পর থেকে দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। দলের মধ্যে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। ফলে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে জোরালো কোনো আন্দোলন ঘরে তুলতে পারেনি দলটি। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কথা বলে দায়সারা কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেন বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা। ফলে খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘ হতে থাকে। অবশেষে করোনা সংকট যেন খালেদা জিয়ার জন্য ‘আশীর্বাদ’ রূপে আসে। তার পারিবারের ঘনিষ্ঠজনদের তৎপরতায় মুক্তি পান খালেদা জিয়া। সরকারের নির্বাহী আদেশে সাজা স্থগিত করে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর থেকে পারিবারিক আবহে গুলশানের বাসায় ‘ফিরোজা’য় দিন কাটাচ্ছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। দলের নেতাকর্মীরা তার সাক্ষাৎ পান না। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকে ডাকা হলে মাঝে-মধ্যে দেখা করার সুযোগ পান।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে দলের সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিএনপিতে কোনো সমস্যা নেই। সবসময় ঐক্যবদ্ধ আছে। এত সমস্যা খুঁজে লাভ নেই। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দিলেই বোঝা যাবে বিএনপি আছি কি নেই।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কমিটি গঠন, দলের সাংগঠনিক তৎপরতা এসব আর ভোটের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। যেখানে সুষ্ঠু ভোট নেই, ভোট চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে, এখানে এসব কথা বলে কী হবে। আমরা তো যুদ্ধ করতে নামতে পারব না, আমরা নির্বাচনে যাচ্ছি, জনগণ যাতে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু জনগণের ভোট চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।

দলের সাংগঠনিক অবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, দলে মতবিরোধ, নেতৃত্বে প্রতিযোগিতা থাকতেই পারে। তবে দলের তিন ভাইস চেয়ারম্যানের বিরূপ মন্তব্য নিয়ে কোনো কথা বলতে চাননি আমীর খসরু।

গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিএনপি ‘আত্মহত্যা’ করে ফেলেছে। এখন মানুষ খালেদা জিয়াকেই ভুলে যাবে। তিনি এখন অসুস্থ। তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দরকার। 

তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে, মাঠে দাঁড়াতে পারছেন না। ঢাকা-৫ আসনে উপনির্বাচনের অনিয়মের প্রতিবাদে একটা বড় সমাবেশও করতে পারল না। এখন মধ্যবর্তী নির্বাচন, পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছে। এর ব্যাখ্যাটা কী? উপনির্বাচনের আবার কি পুনঃনির্বাচন দেবে?। সরকার তো চাইবে তাদের সময়টা পার করার জন্য। এখানে বিএনপির উচিত হবে এটা নিয়ে (উপনির্বাচনে অনিয়ম) সবাই ঐক্যবদ্ধ করা।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, বারবার বলছি বিএনপির এখন উচিত দ্রুত জাতীয় সম্মেলন করে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসা। বিশেষ করে তরুণ নেতাদের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে হবে। যারা বার্ধক্যে পৌঁছেছেন তাদের অবসর নেওয়া উচিত। 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।