শনিবার ২৮ নভেম্বর ২০২০ ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

জোট ছাড়া উপনির্বাচনে বিএনপি
জোট এখন বিএনপির বিষফোঁড়া
নির্বাচনী গণসংযোগে নেই জোটের নেতারা
এম উমর ফারুক
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২০, ৮:৩৫ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

জোট এখন বিএনপির বিষফোঁড়া

জোট এখন বিএনপির বিষফোঁড়া

করোনায়ও পাঁচটি শূন্য আসনের উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে বিএনপি। তবে ড. কামালের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটকে বাদ দিয়েই এককভাবে প্রার্থী দিয়েছে দলটি। নির্বাচনী গণসংযোগে ঐক্যফ্রন্ট কিংবা ২০ দলীয় জোটের ব্যানারে কোনো কর্মকাণ্ড নেই। এ নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট ও জোটের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। বিএনপির নীতি নির্ধারকরা মনে করেন, ঐক্যফ্রন্ট নামের জোট এখন বিএনপির বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়েছে।  

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রাজনীতির বিভিন্ন মেরুকরণে জোটের সৃষ্টি হয়েছে। জোটগুলোর সাথে বিএনপির সমন্বয় আছে। সময়মতো সব কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান হবে। আপাতত বিএনপি তার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। 

বিএনপি ও সমমনা দল নিয়ে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং বাম ঘরানার কয়েকটি দল নিয়ে গঠিত বাম গণতান্ত্রিক জোট অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। এখন তাদের কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম নেই বললেই চলে। কাগজে-কলমে থাকলেও রাজনীতির মাঠে এসব জোটের কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। অথচ বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং বাম গণতান্ত্রিক জোট গঠিত হয়েছিল। গত নির্বাচনের পর ঐক্যফ্রন্টের বিবৃতি আর বাম জোটের সীমিত কিছু কর্মসূচি ছাড়া নেই তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। করোনা ও বন্যার মতো দুর্যোগেও ঐক্যবদ্ধভাবে অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দেখা মেলেনি এই জোট দুটির নেতাদের। দীর্ঘদিন থেকে নেই জোটের কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম কিংবা দলীয় বৈঠক।

বর্তমানে ৫টি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি। ঐক্যফ্রন্ট নেতারা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে বিএনপির একলা চলো নীতির কৌশল হিসেবে দেখছেন। তবে বাম জোট নেতারা বলছেন, এই নির্বাচনে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগে কমিশন কোনো আস্থা তৈরি করতে পারেনি। উল্টো সরকারের ভোট ডাকাতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। 

উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক দল নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্ত নেই। এ বিষয়ে অবশ্যই ঐক্যফ্রন্টে কোনো আলোচনাও হয়নি। তবে বিএনপি নির্বাচনে যাচ্ছে, যেতেই পারে। এটা তাদের দলগত সিদ্ধান্ত।

গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, যে আশা নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। নির্বাচনের পর থেকে জোটের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। কারণ, আমাদের ভেতরে কিছু ভুল বোঝাবুঝি ছিল বা আমরা কিছু নিজেরাই ভুল বুঝেছি। এ জন্যই ঐক্যফ্রন্টের প্রতি মানুষের যে আগ্রহ ছিল এখন তেমন নেই।

অন্যদিকে, নির্বাচনে পরে ঐক্যফ্রন্টের কোনো কর্মসূচি না থাকলেও বাম গণতান্ত্রিক জোট প্রথমদিকে বেশ জোরালো কিছু কর্মসূচি ছিল। নির্বাচনকে ‘ ভোট ডাকাতির নির্বাচন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর এক বছর পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অভিমুখে কালো পতাকা মিছিল বের করে বাম জোট। এ সময় লাঠিচার্জ করে মিছিলটি পণ্ড করে দেয় পুলিশ। আহত হন জোটের শীর্ষনেতা সাইফুল হক, জোনায়েদ সাকিসহ অন্তত ২০ জন বাম নেতা। চলতি বছরে দেশে করোনার মহামারী শুরু হওয়ার পর পাটকল ইস্যুতে প্রেসক্লাবের সামনে মানবন্ধন ছাড়া আর কোনো জোরালো কর্মসূচি নেই জোটটির। তবে বিভিন্ন ইস্যুতে গণমাধ্যমে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে জানান দেন নিজেদের। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উপনির্বাচনকে বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই জোটটির নেতারা।

বাম জোটের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, এই নির্বাচনে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগে কমিশন কোনো আস্থা তৈরি করতে পারেনি। উল্টো সরকারের ভোট ডাকাতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলম বলেন, নৈশকালীন ‘ভুয়া’ ভোটের অভিযানের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রহসন সংঘটিত হয়েছে। দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নির্বাচনের ন্যূনতম পরিবেশকেও ধ্বংস করা হয়েছে। এ রকম একটা অবস্থায় নির্বাচনে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

এদিকে, ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে যে জোটের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস সুদৃঢ় হয়েছিল তা ক্রমান্বয়ে সন্দেহ ও অবিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। ওই নির্বাচনের পর ১৮ দলীয় জোটের কাজী জাফর আহমেদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি এবং সাম্যবাদী দলের একাংশ যোগ দেয়ার মধ্য দিয়ে ২০ দলীয় জোটে রূপান্তরিত হয়। এরপর তা বেড়ে ২৩ দলীয় জোটে উন্নীত হয়। তারপরই শুরু হয় নানা সন্দেহ আর অবিশ্বাস। শুরু হয় জোটত্যাগ এবং জোটত্যাগী দলের তৃতীয় বা চতুর্থ সারির নেতাদের দিয়ে রাতারাতি নতুন নতুন দল জন্ম দেয়ার প্রবণতা।

২০১৪ সালের নির্বাচনের পর প্রথম জোট ত্যাগ করে শেখ আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বাধীন ন্যাপ-ভাসানী। জোটের সংখ্যা ঠিক রাখতে বিএনপি মহাসচিব রাতারাতি বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির গাইবান্ধা জেলার সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আজহারুল ইসলামকে দিয়ে ন্যাপ-ভাসানীর জন্ম দেন। নতুন এ দলের জন্মের পেছনে জোটের দু-একজন শরিক দলের নেতাদেরও ইন্ধন ছিল বলে জানা যায়। এমনও দেখা গেছে, নিজে দল না করলেও সেই দলেরই চেয়ারম্যান হয়ে গেছেন তিনি।

‘২০১৪ সালের নির্বাচনে না যাওয়া ভুল ছিল’ এমন বক্তব্য-কে কেন্দ্র করে ন্যাশনাল পিপলস্ পার্টি- এনপিপি চেয়ারম্যান শেখ শওকত হোসেন নিলুর সঙ্গে জোট নেতাদের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে জোট ত্যাগ করতে বাধ্য হন শেখ শওকত হোসেন নিলু। জোট ত্যাগের বিষয়ে তিনি সবসময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দায়ী করে আসছেন। নিলুর চলে যাওয়ার পরপরই নতুন এনপিপি গঠন করে জোটের সংখ্যা ঠিক রাখা হয়। 

বিএনপির দীর্ঘদিনের বন্ধু ইসলামী ঐক্যজোটও শেষমেষ ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করে। ঠিক একইভাবে রাতারাতি বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে বসে নতুন ইসলামী ঐক্যজোট গঠন করা হয়।

সূত্র মতে, এই মুহূর্তে জোটে ২৩টি দল দৃশ্যমান। দলগুলো হলো- ১. বিএনপি, ২. জামায়াতে ইসলামী, ৩. লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপি (অলি), ৪. বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ৫. খেলাফত মজলিস, ৬. জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা, খন্দকার লুৎফর রহমানের অংশ), ৭. জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা, ব্যারিস্টার তাসমিয়া), ৮. ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এনডিপি (ভগ্নাংশ), ৯. ন্যাশনাল পিপলস পার্টি- এনপিপি (ভগ্নাংশ), ১০. ইসলামি ঐক্যজোট (অস্তিত্বহীন), ১১. বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি (অস্তিত্বহীন), ১২. বাংলাদেশ মুসলীম লীগ (অস্তিত্বহীন), ১৩. ডেমোক্রেটিক লীগ (দলের প্রতিষ্ঠাতা অলি আহমদের মেয়ে), ১৪. সাম্যবাদী দল (যার সাধারণ সম্পাদক ২০০৮ সালের পর বিদেশে অবস্থান করছেন), ১৫. বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- বাংলাদেশ ন্যাপ (ভগ্নাংশ, যার নেতা মূল দলের ঢাকা মহানগরীর একজন সম্পাদক ছিলেন মাত্র), ১৬. ন্যাপ (ভাসানী, ভগ্নাংশ) ১৭. জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), ১৮. জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (কাসেমী), ১৯. জমিয়তে উলামায়ে (ওয়াক্কাস), ২০. বাংলাদেশ জাতীয় দল, ২১. বাংলাদেশ লেবার পার্টি (ভগ্নাংশ), ২২. পিপলস লীগ এবং ২৩. লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি- এলডিপি (শাহাদাত)।





« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।