রোববার ১ নভেম্বর ২০২০ ১৬ কার্তিক ১৪২৭

সবাই এখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্রাইভার পিয়ন কেরানি হতে চায়
তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই
মানুষের কষ্টের ট্যাক্সের টাকা লুটপাটকারীদের ফাঁসি হয় না কেন?
রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৯:১৩ পিএম আপডেট: ২৭.০৯.২০২০ ৫:০১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

রফিকুল ইসলাম রতন

রফিকুল ইসলাম রতন

ভয়াবহ দুর্নীতির সবচেয়ে আলোচিত প্রতিষ্ঠানের নাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দেশের বহু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কম বেশি দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও সবাইকে টেক্কা দিয়ে শীর্ষ স্থান অধিকার করেছে সংস্থাটি। দুর্নীতি-লুটপাট আর অনিয়ম-বিশৃঙ্খলায় আকণ্ঠ ডুবে আছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই স্বাস্থ্য খাত। তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পর্যন্ত সর্বত্রই অভিন্ন চিত্র বিদ্যমান। করোনা মহামারির মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানটি জন্ম দিয়েছে নতুন নতুন দুর্নীতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ। তাদের ওপর ভর করেই ড্রাইভার মালেক, প্রতারক সাহেদ, কর্মচারী আবজাল, ডাক্তার সাবরিনাদের জন্ম হয়েছে। এখন দেশের বেকার যুবকদের একমাত্র চাওয়া হচ্ছে ড্রাইভার পিয়ন কেরানি পদে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একটি চাকরি। 

সম্প্রতি প্রকাশ্যে মালেক, সাহেদ, আবজাল, সাবরিনাসহ কুশীলবদের নাম এলেও এদের পৃষ্ঠপোষক, মদদদাতা, সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা এবং সর্বোপরি অধিদপ্তরের মহাপরিচালকরা রয়েছেন পর্দার আড়ালেই। এসব দুর্নীতি ও অপকর্মের সঙ্গে ঘুরেফিরে মহাপরিচালক, পরিচালক, সহকারী পরিচালক ও অন্যান্য কর্মকর্তার নাম এলেও তারা সুকৌশলে একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার ফন্দিফিকির করছেন।

মালেক কীকরে ড্রাইভার হয়ে এত ক্ষমতাবান? মালেকের পরিবারের ১২ জন সদস্যের কীভাবে অধিদপ্তরে চাকরি হলো? অষ্টম শ্রেণি পাস তৃতীয় শ্রেণির কসর্মচারী ড্রাইভার মালেকের কীকরে ঢাকায় ৭ তলা ২টি বাড়ি, কয়েকটি ফ্ল্যাট, গরুর খামারসহ অঢেল সম্পদ হয়? কীভাবে লাইসেন্সবিহীন রিজেন্ট নামের ভুয়া হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রতারক সাহেদের সঙ্গে চুক্তি করলেন স্বাস্থ্যের তৎকালীন ডিজি? চুক্তি অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হাসিমুখে উপস্থিত থাকলেও এখন কেউ দায় নিচ্ছেন না কেন? কার নির্দেশে এবং কাদের স্বার্থে ভুয়া রিজেন্ট হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হলো? কীভাবে অধিদপ্তরের একজন হিসাবরক্ষক আবজাল দেড় হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে? আবজাল যদি দেড় হাজার কোটি টাকা বিদেশেই পাচার করে, তাহলে তার মোট সম্পদ কত? সরকারি চাকরিবিধি ভঙ্গ করে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের রেজিষ্ট্রার ডা. সাবরিনার প্রতিষ্ঠান কীভাবে করোনা পরীক্ষার কাজ পায়? এদের দুর্নীতি ও অপকর্মের ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর থেকে কর্তৃপক্ষের বড় বড় কথা ও গলাবাজি কী মানায়? দেশের করদাতা সাধারণ মানুষের দাবি, যারা মানুষের শ্রম-ঘামের পয়সা লুটপাট করেছে এবং যাদের সহযোগিতায় এই অপকর্ম সংগঠিত হয়েছে, তাদের প্রত্যেককে প্রকাশ্যে মাজায় দড়ি বেঁধে জাতির সামনে তাদের কলঙ্কিত চেহারা উন্মোচিত করতে হবে। দিতে হবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। 

দেশের সচেতন মানুষের প্রশ্নÑ গত এক দশক ধরে দোর্দন্ড প্রতাপের সঙ্গে ড্রাইভার মালেক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পদোন্নতি, বদলি, ঠিকাদারি ও পরিবহন পুল নিয়ন্ত্রণ করলেও এতদিন কর্তৃপক্ষ কি জেগে ঘুমিয়েছেন? ড্রাইভার মালেক অধিদপ্তরে তার ছেলে, মেয়ে, ভাই, জামাতা, ভাতিজাসহ ১২ জন নিকট আত্মীয়কে চাকরি দেওয়ার বিষয়ে কেন ডিজি অফিস থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে না? কীভাবে এক পরিবারের এতজন সদস্য চাকরি পায়? মালেকের আপন ভাই আবদুল খালেক অধিদপ্তরের ডেসপাচ শাখা ও ভাগনে সোহেল শিকারি প্রশাসন বিভাগের উপপরিচালকের গাড়ি চালান। তার মেয়ে নওরীন সুলতানা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অফিস সহকারী হিসেবে যোগ দিলেও প্রেষণে মতিঝিলের আরবান ডিসপেনসারিতে এবং ভাইপো আবদুল হাকিম অফিস সহকারী হিসেবে প্রেষণে কমিউনিটি ক্লিনিকে আছেন। ভায়রা মাহবুব কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোলে (সিডিসি) গাড়ি চালান। আবদুল মালেকের একজন আত্মীয়ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত আছেন বলে জানা গেছে। মালেক চক্রের সব সদস্যের চাকরির শুরু অধিদপ্তরে, শেষও এখানে।

১৯৮৬ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালকের চাকরি পাকাপোক্ত করে মালেক ক্রমেই হয়ে ওঠেন ‘মালেক সাহেব’। ধীরে ধীরে কবজায় নেন গাড়িচালকদের নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ-বদলি ও পদোন্নতির মতো কাজগুলো। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ তাঁকে বাধা দেননি। র‌্যাব-১ গত রোববার আবদুল মালেককে রাজধানীর তুরাগ থানার দক্ষিণ কামারপাড়ার বাসা থেকে গ্রেফতার করে। তাঁর বেশুমার সম্পদের তথ্যও ক্রমে বেরিয়ে আসতে থাকে। অধিদপ্তরের গাড়িচালকদের নাম ধরে ডাকার রেওয়াজ থাকলেও আবদুল মালেককে সবাই মালেক সাহেব বলে সম্বোধন করেন। এই চক্রকে সহযোগিতা দিয়েছেন ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন। গাড়িচালক আবদুল মালেক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই ব্যক্তির অনুসারী স্বাস্থ্যের তৎকালীন মহাপরিচালক শাহ মুনীর হোসেনের গাড়ি চালাতেন। এরপর যাঁরা মহাপরিচালক পদে এসেছেন, আবদুল মালেক তাঁদের গাড়ি না চালালেও ‘ড্রাইভারস অ্যাসোসিয়েশন’ গঠন করে তাঁর সভাপতি হয়ে বসেন। তাঁর কথামতো ওঠবস করতে শুরু করেন অধিদপ্তরের সব গাড়িচালক।
গাড়িচালক মালেক যে চক্রের সদস্য, সেটির অনেক সদস্য এখনো চাকরিতে বহাল আছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, চক্রের সদস্যদের একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা বাদে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির নথিপত্র ঠিকঠাক করেন। এর বাইরেও তিনি অর্গানোগ্রাম তৈরি, পদ সৃষ্টি ও স্থায়ীকরণের বিষয়টি দেখভাল করেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতির এ চিত্র সাম্প্রতিক কালের নয়। যুগ যুগ ধরে চলমান দুর্নীতির খন্ড চিত্র এটি। মিঠু গংদের মতো সাধারণ ঠিকাদারদের কাছেই জিম্মি হয়ে আছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। অধিদপ্তরের কর্মরত কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারির স্ত্রী ও সন্তানের নামে রয়েছে ঠিকাদারি ব্যবসা। যুগ যুগ ধরে মুখ চেনা একদল ঠিকাদার যন্ত্রপাতি ক্রয়, সরবরাহ, ভবন নির্মান ও স্বাস্থ্য সামগ্রী সরবরাহের নামে প্রকাশ্যে পুকুর চুরি করলেও তথাকথিত দুধে ধোয়া মহাপরিচালক-পরিচালকরা কেউ-ই এর দায়-দায়িত্ব নিতে রাজি নয়। তাহলে এসব ঘটলো কীভাবে? ওনারা যদি হাজিসাব বনে যান তবে সব অপকর্মের দায় কি শুধু কয়েকজন ড্রাইভার, কেরানী, পিয়ন আর ঠিকাদারের? 

স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা হচ্ছে চারপাশে। মালেক, সাহেদ-সাবরিনারা ধরা পড়েছে। রাঘব বোয়াল টাইপের কর্মকর্তারা পদত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে। এসবের ভীড়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সেই দুর্নীতিবাজ হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেন এখন কোথায়? একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও যে হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছিল- সেই দুর্নীতিবাজটার কী অবস্থা? 

দুদকের হিসেবেই তার সম্পদের পরিমাণ ৫০০-৬০০ কোটি টাকা। আবজালের দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর মানুষ অবাক হয়ে ভেবেছে, এও কি সম্ভব! সরকারি সব ভাতা মিলিয়ে যার মাসিক আয় ত্রিশ হাজার টাকার কাছাকাছি, সেই লোক কোন আলাদীনের চেরাগ ঘষে এত টাকার মালিক হয়েছে, সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না। এর চেয়েও বেশি অবাক করার মতো তথ্য হচ্ছে, আবজালের এই কীর্তি গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিলেও, এই দুর্নীতিবাজ বা তার স্ত্রী- কাউকেই এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ! দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও, এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরেই আছে এই কালপ্রিট। দুদকের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আবজাল হোসেনের বাড়ি ফরিদপুরে। ১৯৯২ সালে তৃতীয় বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর আর পড়াশোনা করা হয়নি তার। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফের সুপারিশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৫টি মেডিকেল কলেজ স্থাপন প্রকল্পে অফিস সহকারী পদে অস্থায়ীভাবে যোগ দেয় সে। ২০০০ সালে প্রকল্পটি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হলে আবজাল ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে অফিস সহকারী হিসেবে যোগ দেয়। সেখান থেকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে ক্যাশিয়ার পদে বদলি হয়। পরে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ঢাকায় বদলি হয় সে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে আবজাল স্বাস্থ্য খাতের বড় একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে হাত মেলায়।

আবজাল হোসেনের স্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন শাখার স্টেনোগ্রাফার হিসেবে ১৯৯৮ সালে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে যোগ দেন; কিন্তু দুর্নীতির কারণে তার চাকরি চলে যায়। স্বামী-স্ত্রী দু’জনের মধ্যে প্রতিযোগীতা হতে পারে, কে কার চেয়ে বড় দুর্নীতিবাজ এই নিয়ে। এমন মানিকজোড় সচরাচর দেখা যায় না। যাই।হোক, চাকরি হারানোর পরে আবজাল তার স্ত্রীকে রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক সাজিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করে। বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজে যন্ত্রপাতি সরবরাহের কাজ পেতে সে স্ত্রী রুবিনা খানমের নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স করে।

গত দশ-বারো বছরে আবজাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং টেন্ডার কমিটির সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে এককভাবে শত শত কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নিয়েছে। অন্য কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যাতে কাজ না পায় সেজন্য আবজাল নিজের স্ত্রী ছাড়াও তার ভাই ও শ্যালকের নামে ট্রেড লাইসেন্স করে তাদের সর্বোচ্চ দরদাতা দেখিয়ে একচ্ছত্রভাবে যন্ত্রপাতি সরবরাহের কাজ বাগিয়ে নেয়। এভাবে আবজাল কয়েকটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহের নামে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এমনকি অনেক হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেই সে বিল তুলে নিয়েছিল। আবজালের মাসিক বেতন ছিল সব মিলিয়ে ৩০ হাজার টাকার মতো। অথচ সে ‘হ্যারিয়ার ব্র্যান্ডের’ গাড়ি ছাড়া চলাফেরা করতো না।

ওই দম্পতির সম্পদের লিস্ট তৈরি শুরু করলে সেটা শাহনামার চেয়ে বড় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। ঢাকার উত্তরায় তাদের পাঁচটি বাড়ি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে একটি বাড়ি, দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২৪টি প্লট ও ফ্ল্যাট আছে। এর বাইরে দেশে-বিদেশে আছে বাড়ি-মার্কেটসহ অনেক সম্পদ। মোট সম্পত্তির পরিমাণ হাজার কোটি টাকার কম হবে না বলেই ধারণা। দুদকের এক কর্মকর্তা আবজালের এই বিশাল পরিমাণ দুর্নীতির খবর শুনে আঁতকে উঠে বলেছিলেন, এই লোক কি সরকারী কর্মচারী, নাকি টাকা ছাপানোর মেশিন? 

আসলে ধরতে হবে রাঘব বোয়ালদের। ওইসব ভালো মানুষ সাজা মহাপরিচালক-পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে হাতকড়া পড়াতে হবে। প্রয়োজনে পুরো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও লুটপাটের আসল ঘটনা উদঘাটনে দুদক, বিচারক, পুলিশ, র‌্যাব ও প্রশাসনের সমন্বয়ে গঠন করতে হবে সমন্বিত তদন্ত কমিশন। তা না হলে দিন দিন স্বাস্থ্য খাতে গড়ে ওঠা দুর্নীতি-বিশৃঙ্খলার এই বিশাল শ্বেতহস্তী দমন করা সম্ভব হবে না।

টিআইবির এক রিপোর্ট সূত্রে জানা যায়, দেশের বৃহত্তম ও পুরনো ঐতিহ্যবাহী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটসহ রাজধানীর সব সরকারি হাসপাতালেই অনিয়ম-দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার একই রকম চিত্র বিদ্যমান। স্বাস্থ্য খাতে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হলেও এসব বরাদ্দের কতটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে, এর থেকে জনগণ কতটা সুবিধা পাচ্ছে, এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে তত্ত্ব-তালাশ নেওয়া হয় না বললেই চলে। মাঝে মাঝে গণমাধ্যমের রিপোর্টে বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনিয়ম-দুর্নীতির কদাকার চিত্র বেরিয়ে এলে নামমাত্র তদন্ত কমিটি হয়। বেশির ভাগ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট বা সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় না। অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতা বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অবস্থার কাক্সিক্ষত পরিবর্তনও হয় না। স্বাস্থ্য সেক্টরে বদলি, পদোন্নতি, পোস্টিং থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি, লুটপাট রীতিমতো ওপেন সিক্রেট ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এর আওতাভুক্ত অধিদপ্তরগুলোর বিভিন্ন ইউনিটে শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগকে ঘিরে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বাণিজ্য চলে খোলামেলাভাবেই। হাসপাতালের সরঞ্জামসহ নানা কিছু কেনাকাটার ক্ষেত্রে রীতিমতো সাগর চুরির ঘটনাও ঘটছে অহরহ। অতি সম্প্রতি ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের বিভিন্ন আইটেমের চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি ও ওষুধপত্র কেনার ক্ষেত্রে যে লুটপাট হয়েছে তা চমকে দেওয়ার মতো। ১০-১২ হাজার টাকা দামের অটোস্কোপ মেশিন ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকায়, ১৫ হাজার টাকার ব্ল্যাড ওয়ার্মার মেশিন ৯ লাখ ৩২ হাজার টাকায়, ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা দামের এমআরআই মেশিন ৯ কোটি ৯৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কিনেছে সংশ্লিষ্ট ক্রয় কমিটি। সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত বিধিবিধান অমান্য করে দ্বিগুণ থেকে ৫০ গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে। 

হাসপাতাল আছে, যন্ত্রপাতি ওষুধপথ্যের সরবরাহ যাচ্ছে নিয়মিত, আছে চিকিৎসক, নার্স, আয়াসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী; শুধু নেই কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা। রাজধানী থেকে শুরু করে নিভৃত পল্লী পর্যন্ত সর্বত্রই অভিন্ন অবস্থা। চিকিৎসকের বদলে নার্স, ওয়ার্ডবয়, আয়াসহ দালালরা নানা কায়দা-কৌশলে অসহায় রোগীদের কাছ থেকে অবৈধ উপায়ে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। এসব দেখভালের যেন কেউ নেই। 

এ ছাড়া বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে চিকিৎসকরা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিশন নিচ্ছেন। আর দালালরা নিচ্ছেন ১০ থেকে ৩০ শতাংশ। দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা এতটাই বেহাল যে, একজন চিকিৎসকের বিপক্ষে সেবাগ্রহিতার সংখ্যা তিন হাজার ২৯৭ জন। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, চিকিৎসক ও রোগীর অনুপাত হওয়ার কথা ১ : ৬০০। গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যমতে, এ খাতে অ্যাডহক চিকিৎসক ও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ১ থেকে ৬৫ লাখ টাকা, বদলির ক্ষেত্রে ১০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকা এবং পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়ে থাকে। এসব ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, বিভাগ, সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ স্বাস্থ্য খাতের প্রতিটি বিভাগের সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িত। এরা কী যুগে যুগে এভাবেই পার পেয়ে যাবে? হায় আল্লাহ, আমাদের রক্ষা করুন। 

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।