রোববার ১ নভেম্বর ২০২০ ১৬ কার্তিক ১৪২৭

ভ্রমণ ব্যয়ে যাবে সাত কোটি টাকা
ইলিশ উন্নয়নে একনেকে আজ ওঠছে আড়াইশো কোটি টাকার প্রকল্প
জোনায়েদ মানসুর
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০, ৯:০৩ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

ভ্রমণ ব্যয়ে যাবে সাত কোটি টাকা

ভ্রমণ ব্যয়ে যাবে সাত কোটি টাকা

সাত কোটি টাকা ভ্রমণ ব্যয় ! তাও আবার ইলিশসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের নামে। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নিজেদের মধ্যেও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে জানান, ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ। আর বিশ্বের মধ্যে ইলিশ উৎপাদনে শীর্ষে বাংলাদেশ। মোট উৎপাদনের ৬৬ শতাংশ দেশেই হয়। বাংলাদেশের কর্মকর্তারা কোথায়, কেনো, ইলিশসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ভ্রমণে যাবেন তাও উল্লেখ করা হয়নি প্রস্তাবনা পত্রে। সংশ্লিষ্টদের অনেকেই জানান, ইলিশসম্পদ উন্নয়ন নামে ২৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকার প্রস্তাবিত প্রকল্পে কর্মকর্তাদের ভ্রমণ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই ভ্রমণ দেশে না বিদেশে সেটি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি প্রস্তাবনা পত্রে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটিতে ১৭৪ জন কর্মকর্তার ভ্রমণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৯৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা। যা প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তবে এ ব্যয়কে অতিরিক্ত বলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, দেশীয় জাতীয় মাছ ইলিশ উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ভ্রমণ ব্যয় লুটপাট ছাড়া কিছুই না। আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ইলিশসম্পদ উন্নয়ন নামে ২৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকার প্রকল্প উপস্থাপন করা হতে পারে। 

ইলিশসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে প্রস্তাবিত প্রকল্পের কর্মকর্তাদের ভ্রমণ ব্যয় বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম রোববার রাতে স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।’ এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সম্প্রতি জানিয়েছেন, ‘দেশে হোক আর বিদেশে হোক, প্রয়োজন হলে কর্মকর্তারা ভ্রমণ করবেন। তারা ভ্রমণের বিরুদ্ধে নন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যেসব প্রস্তাব আসছে সেগুলো ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না। অহেতুক ভ্রমণের নামে অর্থ অপচয় কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। তার পক্ষে প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) প্রত্যেকটি পৃষ্ঠা উল্টে দেখা সম্ভব হয় না। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা (সচিব) অনেক অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তারা প্রস্তাবের সবকিছু দেখে এবং মূল্যায়ন করেই একনেক উপস্থাপনের জন্য সুপারিশ করে থাকেন। তারপরও যদি অপচয়ের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নের যেকোনো পর্যায়েই হস্তক্ষেপ করা হবে।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মৎস্য অধিদফতরের উপপরিচালক (অর্থও পরিকল্পনা) হাসান আহম্মেদ চৌধুরী বলেন, ‘এসব ভ্রমণ বিদেশে নয়, দেশের ভেতরেই হবে। এজন্য যতটা সম্ভব ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে প্রকল্পটি ২৯টি জেলার ১৩৪টি উপজেলায় বাস্তবায়িত হবে। মাঠ পর্যায়ে সার্ভিলেন্স টিম কাজ করবে। বিশেষ করে জাটকা মৌসুম ও মা ইলিশ মৌসুমে সার্ভিলেন্স টিমকে বেশি কাজ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবসময় চেষ্টা করি সরকারের রাজস্ব থেকে আয় করা অর্থের সঠিক ব্যবহার করতে।’

এ বিষয়ে প্রকল্পটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লীপ্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) জাকির হোসেন আকন্দ পরিকল্পনা কমিশনের মতামত দিতে গিয়ে বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়ানোর মাধ্যমে আমিষের চাহিদা পূরণ হওয়ার পাশাপাশি ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা বাড়বে ও উপকূলীয় জেলেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। তাই প্রকল্পটি অনুমোদনযোগ্য।’

জানা গেছে, মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এ প্রকল্প প্রস্তাব করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ২৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে এর প্রক্রিয়াকরণ শেষ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। অনুমোদন পেলে দেশের ২৯টি জেলার ১৩৪টি উপজেলায় চলতি বছর থেকে ২০২৪ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে মৎস্য অধিদফতর।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্র জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় ইলিশের ছয়টি অভয়াশ্রম পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করা হবে। ইলিশ অভয়াশ্রম সংলগ্ন ১৫৪টি ইউনিয়নের জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ১ হাজার ২৩২টি সভা, ৬০টি নানা ধরনের কর্মশালা, অভিযান পরিচালনার জন্য ১৯টি বোট কেনাসহ মা ইলিশ সংরক্ষণে ১৩ হাজার ৪০০টি মোবাইল কোর্ট ও জেলে পরিবারে বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য ১৮ হাজার জেলেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় ও আমিষ সরবরাহে ইলিশের গুরুত্ব অনেক। দেশের মোট মাছ উৎপাদনে ইলিশের অবদান সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ। ইলিশ জিডিপির ১ শতাংশে অবদান রাখে। উপকূলীয় মৎস্যজীবীদের আয়ের প্রধান উৎস ইলিশ আহরণ। প্রায় ৫ লাখ মানুষ ইলিশ আহরণে সরাসরি নিয়োজিত এবং ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষাভাবে জড়িত। সারা বিশ্বের মোট উৎপাদিত ইলিশের ৬০ শতাংশ আহরিত হয় বাংলাদেশে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ওপর গত ৮ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। ওই সভায় দেওয়া সুপারিশ গুলোর অন্যতম হচ্ছে, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে জেলে প্রতি ২৫ হাজার টাকা নগদ প্রদানের পরিবর্তে স্থানীয় চাহিদার জন্য সমপরিমাণ টাকার উপকরণ এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে ও প্রশিক্ষণার্থীদের মোবাইল নম্বরসহ ডাটাবেজ সংরক্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে উপকরণের বিবরণ ও পরিমাণ, উপকরণভিত্তিক প্রশিক্ষণের ট্রেড নির্ধারণ, প্রশিক্ষণের মেয়াদকাল, প্রশিক্ষণ কারিকুলাম, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাদির তথ্যাদি ডিপিপিতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

এছাড়া অবৈধ কারেন্ট জাল ধ্বংস করে জেলেদের মৎস্যবান্ধব জাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বাজার দরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জালের মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। তাছাড়া জালের নাম ব্যাস, সূতার মান সুনির্দিষ্টভাবে ডিপিপিতে উল্লেখ করতে হবে। প্রকল্পের আওতায় নিখোঁজ ৫০ জন জেলের পরিবারের জন্য এক লাখ করে আর্থিক সহায়তা প্রদান আইটেমটি প্রকল্প থেকে বাবদ দিতে হবে। শুধুমাত্র মা ইলিশ সংরক্ষণের নদী, মোহনা, মাছঘাট, আড়ত ইত্যাদিতে ২২ দিনের অভিযান পরিচালনার জন্য অভিযান প্রতি ৫ হাজার টাকার সংস্থান ডিপিপিতে রেখে এ আইটেমের ব্যয় কমিয়ে প্রাক্কলন করা যেতে পারে।
পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় ৬০ হাজার পোস্টারর ছাপানোর জন্য পোস্টারপ্রতি ৫০ টাকা হারে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের সংস্থান বাজার দর যাচাই করে যৌক্তিক করতে হবে। নোট বুক প্রস্তুত বাবদ প্রাক্কলিত ৪০ লাখ টাকা ডিপিপি থেকে বাদ দিতে হবে। এছাড়া প্রকল্প থেকে বাদা দিতে হবে আওতায় ২ কোটি ১৭ লাখ ৮ হাজার টাকার প্রাক্কলিত বিলবোর্ড স্থাপন আইটেমটি। প্রকল্পের আওতায় জেলেদের আইডি কার্ড হালনাগাদকরণ আইটেমটি বাদ দিতে হবে। আর বাদ দিতে হবে মৎস্য মেলা।


« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »






সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।