বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০ ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন
পাটকল শ্রমিকদের অর্ধেক টাকা নগদে বাকিটা সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে পরিশোধ
হরলাল রায় সাগর
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২০, ১০:৩৭ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

পাটকল শ্রমিকদের অর্ধেক টাকা নগদে বাকিটা সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে পরিশোধ

পাটকল শ্রমিকদের অর্ধেক টাকা নগদে বাকিটা সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে পরিশোধ

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলসমূহের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হলেও পাটকল শ্রমিকদের ঠকানো হবে না। তাদের দুই ধাপে টাকা দেওয়া হবে। অর্ধেক দেওয়া হবে নগদ, বাকি অর্ধেক দেওয়া হবে পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে। পাশাপাশি শ্রমিকদের পুনর্বাসন করা হবে। আর পাটকল শ্রমিকরা গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের আওতায় কে কত টাকা পাবেন তা আগামী তিন দিনের মধ্যে জানা যাবে। গতকাল শুক্রবার এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী।

গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে শ্রমিকদের শতভাগ পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলসমূহের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণার বিষয়ে রাজধানীর সিদ্ধেশরীতে মন্ত্রীর নিজ বাসভবনে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান, বস্ত্র ও পাট সচিব লোকমান হোসেন মিয়া, শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব কে এম আব্দুস সালাম এবং পাটকল শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এসময় শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান বলেছেন, পাটকল বন্ধ ঘোষণা বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে মনে হচ্ছিল শ্রমিকের কথা ভেবে উনি কাঁদছিলেন। আমাদের চেয়ে শ্রমিকের প্রতি বেদনা প্রধানমন্ত্রীর বেশি।

বৃহস্পতিবার গণভবনে মুখ্য সচিব, অর্থ সচিব, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠক করেন। বৈঠকে পাটকল শ্রমিকদের শতভাগ পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানানো হয়, প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিককের পাওনা টাকা সরাসরি তাদের অ্যাকাউন্টে দেওয়া হবে। এজন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যাদের পাওনা দুই লাখ টাকার কম তারা শতভাগ টাকা নগদ পাবেন। বাকিরা পাওনার ৫০ শতাংশ টাকা নগদ পাবেন এবং বাকি ৫০ শতাংশ পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে পাবেন। গণভবনে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতেই বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। 

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, ‘এক বছর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের বিষয়টি ঠিক হয়েছে। আমরা যেহেতু লোকসানের ভার বইতে পারছিলাম না, দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হবে, তাই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল এগুলোকে (সরকারি পাটকল) কীভাবে আরও উন্নত মানের করা যায় (সে বিষয়ে)।’

তিনি বলেন, পুরনো টেকনোলজি দিয়ে আমাদের এই কারখানাগুলো টিকতে পারছে না। মাসের পর মাস লোকসান করছে। এখানে আমাদের শ্রমিক ভাইয়েরা দায়ী না-এটা প্রধানমন্ত্রী বলেছেন। মন্ত্রী বলেন, ‘গতকাল প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই শ্রমিক ভাইয়েরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আন্দোলন করেছেন। এক লাখ শ্রমিক বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আন্দোলন করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন। এ কথা বলতে গিয়ে তিনি কিন্তু চোখের পানি ফেলেছেন। বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিল এরা, এদের তো পুনর্বাসন করতে হবে, এদেরকে আরও প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় কি-না?। অর্থসচিবকে বলেছেন এদেরকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করো, তাদেরকে আমার দরকার, তাদেরকে হারাতে চাই না। প্রধানমন্ত্রীর পাট শ্রমিকদের প্রতি কেন যেন এত মায়া?’

প্রধানমন্ত্রী নিজে পাটকল শ্রমিকদের দায়িত্ব¡ নিয়েছেন জানিয়ে গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, ‘আমি শ্রমিক ভাইদের বলব, যেখানে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন সেখানে ভাববার কোনো বিষয় নেই। আপনারা খুবই নিরাপদে আছেন, খুব শান্তিতে থাকবেন-এই আমার ধারণা।’

শ্রমিকরা অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকাটাই স্বাভাবিক। অনেকে বলেছেন কী পাব না পাব জানব কীভাবে? চলতি মাসের বেতন এ সপ্তাহের শেষের দিকে আপনাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। আরও দুই মাস নোটিশ পিরিয়ড আছে। পরের মাসের প্রথম সপ্তাহে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা চলে যাবে।’ তিনি বলেন ‘এরপর বাজেট ক্লিয়ারেন্স হবে। এরমধ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনদিনের মধ্যে তালিকা তৈরি করতে। এরমধ্যে আপনারা (পাটকল শ্রমিকরা) জেনে যাবেন কে কত পাচ্ছেন না পাচ্ছেন। সেটা আপনারা অবগত হবেন।’

গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, ‘সরকারি টাকা, এখানে মাঝখানে কেউ নেই, মাঝখানে কোনো দালাল নেই। যেটা সলিড যেটা আছে...সমস্ত সুবিধা-গ্রাচ্যুইটি, অবসর সুবিধা, গোল্ডেন হ্যান্ডশেক সেটাও তারা পাবেন। তাদেও পাওনা হিসাব আমরা ২০১৫ সালের মজুরি অনুযায়ী করেছি। ২০১৫ সালের মজুরি না হলে অর্ধেক টাকায় আমরা পারতাম। প্রধানমন্ত্রী আমাকে ফোন করে বলেছেন, আমাদের শ্রমিক লোকেদের ঠকাতে পারবা?’ পাট শ্রমিকদের আমরা কোনোভাবে ঠকাবো না-এই নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রী আমাকে দিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন পাটমন্ত্রী।

শ্রমিকদের অর্ধেক টাকা নগদে আর অর্ধেক টাকায় সঞ্চয়পত্র কিনে দেওয়া হবে জানিয়ে পাটমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দেখ, আমাদের দেশে বাপেরা টাকা পেলে ছেলেরা গিয়ে বাপকে চাপ দেয় টাকা দাও। বাপের কাছ থেকে জোর করে টাকা নিয়ে চলে যায়। তখন ভাত না খেয়ে মরে। জামাই বলে টাকা দাও নইলে তোমার মেয়েকে নিয়ে যাও। এ ধরনের অনেক ইতিহাস আছে। এজন্য তিনি বলেছেন, অর্ধেক টাকা দিয়ে সঞ্চয় পত্র কিনে দেব যাতে কেউ টাকা না নিয়ে যেতে পারে। এটার লাভ দিয়ে ভাঙিয়ে ভাঙিয়ে খাবে।’

শ্রমিকের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বেদনা অনেক বেশি : সংবাদ সম্মেলনে শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান বলেছেন, ‘যখন পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত হলো আমি বললাম এটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে হবে। গত ২৬ তারিখ আমি যখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলি মনে হচ্ছিল সেদিন শ্রমিকের কথা ভেবে উনি কাঁদছিলেন। আমাদের চেয়ে শ্রমিকের প্রতি বেদনা প্রধানমন্ত্রীর বেশি।’

শ্রম প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাটকল বন্ধ ঘোষণা করা মানেই কিন্তু এগুলো শেষ করে দেওয়া না। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় নতুন করে যাত্রা শুরু করবে পাটকল। এতে লোকসান হবে না। বরং এর মাধ্যমে উৎপাদন বাড়বে, অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।

তিনি বলেন, পাটকল বন্ধ হওয়া মানে আমার দৃষ্টিতে শ্রমিকরা কর্মহীন হচ্ছে না, ভালো জায়গায় যেতে হলে কিছু বেদনা থাকবে। তবে আমার দাবি থাকবে যাতে টাকাগুলো শ্রমিকরা এককালীন পান। আমরা পিপিপি করছি মানে মালিকানা চলে যাবে না। এখানে অংশীদারিত্ব থাকবে, বাইরের কোনো মালিকানা থাকবে না।

তিনি আরও বলেন, আমরা ৬০ বছরের পুরনো মেশিনের স্থলে নতুন মেশিন বসাতে চাই যার মাধ্যমে উৎপাদন বাড়বে। সেখানে আমাদের পুরনো শ্রমিকরা অগ্রাধিকার পাবেন, যারা কাজ করতে চান। 

সিদ্ধান্ত : বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১ জুলাই থেকে বন্ধ ঘোষণা করা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের প্রতিজন শ্রমিক গড়ে ১৩ লাখ ৮৬ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৫৪ লাখ টাকা পর্যন্ত পাবেন। তাদের পাওনার অর্ধেক নগদে পরিশোধ ও বাকি অর্ধেক সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে দেওয়া দিবে সরকার। লোকসান থেকে বাঁচাতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে অবসরে পাঠানো হচ্ছে বলে গত ২৮ জুন ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এক সভায় রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »



সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।