বৃহস্পতিবার ১৩ আগস্ট ২০২০ ২৯ শ্রাবণ ১৪২৭

টঙ্গীতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে সোহেল রানার পরিবার
শেখ রাজীব হাসান, টঙ্গী প্রতিনিধি
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২০, ৪:২৮ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

 
টঙ্গীতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে সোহেল রানার পরিবার

টঙ্গীতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে সোহেল রানার পরিবার

পাখির প্রতি ভালবাসা আমাদের যুগ যুগের আর পাখির প্রতি প্রেম ভালোবাসায় ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন টঙ্গীর সোহেল রানা। স্ত্রী, সন্তান আর বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে তার বিশাল পরিবার। বিভিন্ন প্রজাতির যে পাখি তার সংরক্ষণে তার প্রত্যেকটি তার সন্তান তুল্য। নিজ সন্তানদের মতোই পাখির সেবাযতœ করেন সোহেল রানা। প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংসে আজ উন্মত্ত পৃথিবী। এ কঠিন বাস্তবতায় ষড়ঋতু ও বৃক্ষলতাবিহীন এ নগরীতে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে নানা প্রজাতির পাখি। শক্তিমানরা টিকে থাকে, দুর্বলরা বিলুপ্ত হয়- ডারউইনের এ যুক্তি আর মানতে পারছি না। কারণ শক্তিমান পাখি চিল, শকুন, বাজ যা প্রায় হারিয়ে গেছে, কিন্তু কিছু মানুষের ভালোবাসায় কিছু পাখি তাদের স্বাধীনতা নিয়ে টিকে আছে এখনও। নগরায়ণের নখরে ক্ষতবিক্ষত হয়েও পাখির চঞ্চলতা এ নগরীর প্রাণবৈচিত্র্যে দিয়েছে অনন্য শোভা। মানুষের সঙ্গ পাখিদের মন ছুঁয়ে যায়। খাবার পেলে কাছে আসে, আবার অনাদর আর অবহেলায় অভিমানে দূরে সরে যায়। নগরায়ণের পরিধি যত বিস্তৃত হচ্ছে, জীববৈচিত্র্যের জগৎ তত সংকুচিত হচ্ছে। এ ক্রান্তিলগ্নে নগরীর ফ্ল্যাট সংস্কৃতির সম্মোহনে প্রকৃতি ও পাখির সঙ্গে বন্ধনহীন মুঠোফোনের পর্দায় বন্দি আমাদের জীবন। যে জীবনে আছে শুধু স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, অন্তর্মুখিতা। প্রাণহীন পুতুল, মনোগ্রামের ছবি, খেলনা পাখি এ যুগের শিশুদের সঙ্গী। অথচ চোখ ফেরালেই আমাদের চারপাশে দেখতে পেতাম পাখি আর পাখি। দলবেঁধে আসা, চঞ্চু দিয়ে খুটে খুটে খাওয়া, ঠোঁট ডুবিয়ে পানি খাওয়া, উড়ে যাওয়া, মিটমিট করে তাকিয়ে থাকা, বালি বা মাটিতে গর্ত করে শয়ন, রোদে অবগাহন। হঠাৎ উড়াল, হঠাৎ আড়াল- এত মায়াবী, এত আদুরে পাখি, মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকি! পাখিদের এ দুরন্তপনা আমাদের চিরচেনা।

ছোট বেলা থেকেই পাখির প্রতি সোহেল রানার ছিলো আঘাত ভালোবাসা। পড়াশুনা আর পারিবারিক কারণে বাল্যকাল পেরিয়ে গেলেও বিয়ের পর পাখির প্রতি সোহেল ভালবাসা দেখে স্ত্রী চামেলী আক্তার চৈতির অনুপ্রেরণায় ২০১৪ সালে নিজের বাসস্থনের নামকরণ করেন পাখির নীড়। সংগ্রহ করেন নানা প্রজাতির দেশী বিদেশী পাখি। বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাখির খামার নিরাপদ নীড় তার বাড়ীতেই।  বর্তমানে তার সংগ্রহে আড়াই শতাধিকের ও বেশী পাখি রয়েছে। 
টঙ্গীতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে সোহেল রানার পরিবার

টঙ্গীতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে সোহেল রানার পরিবার



সোহেল রানার সংগ্রহকৃত পাখি

প্যারাকিট (একটু বড় পাখি) জাতের প্রায় অনেক রকমের পাখি আছে তাঁর কাছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মলুক্কান কাকাতুয়া (পূর্ব ইন্দোনেশিয়ার নেটিভ), আফ্রিকান গ্রে প্যারট, ইলেকটাস প্যারট (নিউগিনি বা সলোমন আইল্যান্ডের নেটিভ পাখি), বøæ অ্যান্ড গোল্ড ম্যাকাও, ক্যাটাগনিয়ান কনুর, গালা কাকাতুয়া, চ্যাটারিং লরি, বø্যাকক্যাপ লরি, ইয়োলো বিপ লরি, রেড লরি, মলুক্কান রেড লরি, বøæ মাউনটেন লরি, রেইনবো রেড কালার লরি, পারফেক্ট লরি, বø্যাক উইং লরি, কার্ডিনাল লরি, বøæ স্টিক লরি, সান কনুর, গোল্ডেন হেড কনুর, ইয়োলো সাইডেড কনুর, পাইনাপেল কনুর, বøæ কনুর, এলবিনো রিংনেক ইত্যাদি।

আরো আছে ময়ুর, ডায়মন্ড ডোভ, গ্রিন চিক কনুর, পাইড বেঙ্গলি, ক্যালিফোর্নিয়ান কোয়েল, বাজিরিকা, কালিম পাখি, লাভ বার্ড, জাপানিজ ক্রেস্টেড, সিরাজি কবুতর, সাদা চিনা হাস, পকিস্তানি আচিল মোড়গ ও দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতীর হাঁস মুরগী ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে অনেকটাই দুর্লভ।
টঙ্গীতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে সোহেল রানার পরিবার

টঙ্গীতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে সোহেল রানার পরিবার


উল্লেখ্য, খাঁচার পাখি দুইভাবে পালা যায়। খাঁচায় এবং কলোনি করে। কলোনি হলো খোলা জায়গায় ছেড়ে পাখি পালা। সোহেল রানা দুই জায়গায়ই সফলতা পেয়েছেন। একদিকে পাখির কলোনি করে সফল হয়েছেন। অন্যদিকে সান কনুর, রেড লরির মতো পাখি খাঁচায় ব্রিড করিয়েছেন।
তাঁর ময়ূর নাচে।

সোহেল রানার উঠানের খোলা মাঠে ময়ূর নাচে। পেখম মেলে রঙের ফোয়ারা ছোটায়। ৪টির মতো ময়ূর আছে তাঁর অ্যাভিয়ারিতে (পক্ষীশালায়)।  ব্যক্তিগত সংগ্রহে ময়ূর দেশে বোধ হয় সহজে কেউ রাখেনা।

সোহেল রানা বলেন, ‘ময়ূরের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে ৩০ দিন লাগে। নানা রকম বীজ আর শাকসবজি খেতে পছন্দ করে ওরা। আমার পক্ষীশালার বড় আকর্ষণ এই ময়ূরগুলো।’

তাঁর ভান্ডারে ম্যান্ডারিন ডাক
খুব সুন্দর পাখি ম্যান্ডারিন ডাক।  মাঠে প্রায় ৮ ফুট বাই ৮ ফুট ঘর করে এই পাখি পালা যায়। ‘এক জোড়ার দাম প্রায় ৩০ হাজার টাকা।’  ম্যান্ডারিনের ঘরে জলাধারও করেছেন সোহেল রানা। সেখানে ওরা ভেসে বেড়ায়।

তবে শুরুটা সহজ ছিল না
শুরুটা ছিলো ২০১৪ সালের ঘটনা। অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিল সোহেল। পাখি দেখাশোনা করত তার স্ত্রী চৈতী। একটি ‘শখের পাখির হঠাৎ মৃত্যু আমাকে জেদি করে তোলে। ভাবলাম সফল আমাকে হতেই হবে। ইন্টারনেটে পড়াশোনা শুরু করি। পাখিদের আচার-আচরণ বোঝার চেষ্টা করেছি। পাখি মারা গেলেই আমি পড়াশোনা নতুন উদ্যমে শুরু করতাম। খুঁজতাম সমাধান। বলতে পারেন ঠেকে ঠেকেই শিখেছি।’
ম্যান্ডারিন ডাক, চ্যাটারিং লরি, বø্যাক ক্যাপড লরি, প্রিন্সেস অব ওয়েলস, ক্যালিফোর্নিয়ান কোয়েল ইত্যাদি পাখির বাচ্চা উৎপাদন করেছি। ‘অনেকে ২০ কিংবা ৩০ বছরে পাখি পালন করে যতটা সফল হয়েছে, আমি মাত্র ছয় থেকে সাত বছরে তার চেয়ে বেশি সফলতা পেয়েছি।’
টঙ্গীতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে সোহেল রানার পরিবার

টঙ্গীতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে সোহেল রানার পরিবার


ভালোবাসি সন্তানের মতো
‘পাখিকে আমি আমার সন্তানের মতো ভালোবাসি। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ের মতো ওদের ছাড়াও আমি থাকতে পারি না।’ আমার পোষা পাখিদের পরিবারের সদস্য ভেবেই সাথে নিয়ে খাওয়া থেকে শুরু করে প্রায় সময় একসাথে ঘুমায় ছেলে মেয়ে দুজনেই। সোহেল রানার স্ত্রী পাখির পরিচর্যার কাজে সব চাইতে বেশী সাহায্য করেন। পাখিগুলো দেখে আত্মীয়-স্বজন ও স্থানীয় লোকজন আনন্দ অনুভব করে।

পাখির যত-আত্তি, খাবার
খোলা মাঠ নেট দিয়ে ঢাকা পাখিগুলো এখানে দিনের বেলায় ইচ্ছে মতো উড়ে বেড়ায়। সোহেল পরিবারের খাবারের প্রতি যেমন যতœবান, পাখির জন্যও তাই। এক দিন ফল, এক দিন শাক - সবজি, এক দিন এগ ফুড দিই ওদের। ফলে ফিজিক্যালি পাখিগুলো অনেক শক্ত।’ ছোট ভাই সোহেলকে পাখি পালনে সহায়তা করেন।

পোষ মানানো
এ ক্ষেত্রে পাখি উন্মুক্ত পরিবেশে ঘুরে বেড়াবে, তবে উড়ে যাবে না। ডাক দিলে হাতে আসবে। আদেশ-নিষেধ শুনবে। সোহেল রীতিমতো পাখিদের পোষ মানানোর ব্যাপারে এক্সপার্ট। অসংখ্য পাখি তিনি পোষ মানিয়েছেন। বনের শালিকও পোষ মানাতে সফল সোহেল রানা। বøও এন্ড গোল্ড মেকাও ও গ্রে প্যারট সবচেয়ে প্লে ফুল পোষ মানানো পাখি। সারাক্ষণ খেলাধুলা করে। মানুষের সঙ্গে বেশ ভালো বন্ধুতা গড়ে। পাখিকে কিভাবে সহজে পোষ করা যায়? বললেন, সময় দিতে হবে। ছোট বেবি হ্যান্ড ফিড মানে হাতে করে খাওয়াতে হবে। পাখির সঙ্গে কথা বলতে হবে। কথা শুনলে পুরস্কার যেমন—খাবার দিতে হবে। না শুনলে মৃদু শাস্তি দিতে হবে। সতর্ক করে তিনি বললেন, পাখি পোষ মানাতে ঘরে নিরাপদ বেশি। বাইরের পরিবেশে ততটা নয়।

পাখি পালনে সহযোগীতা
পাখি পালনে কারো কোনো সমস্যা হলে ছুটে যান সোহেল রানার কাছে। অ্যাভিয়ান কমিউনিটি অব বাংলাদেশ সংস্থার। এটি সরকার অনুমোদিত সংস্থা। সোহেল এই সংস্থার বিভিন্ন নির্দেশনা ফলো করেন। এই সংস্থা পাখি প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে । প্রচুর পড়াশোনা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিদেশি পাখির লালন-পালন ও ব্রিডিং সিস্টেমের স্থানীয় কায়দা তিনি বের করে ফেলেছেন।  তাঁরটি দেখে নতুনরা শিখতে পারছে। সোহেল নতুনদের পাখি বিষয়ে বেসিক জ্ঞান অর্জন, পাখির ফার্ম ভিজিট, বড় ব্রিডারদের সঙ্গে যোগাযোগ, শুরুতেই ব্যাবসায়িক চিন্তা না করা ও পাখির যতœ নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

সবার জন্যই খোলা
দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত তার পাখির নীড়। পাখি দেখতে এসে কেউ না খেয়ে ফেরত যায়নি। আপ্যায়ন না করে তিনি ছাড়েনই না। হোক না অপরিচিত। স্কুল-কলেজ, মাদরাসার ছাত্র-ছাত্রী, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্মকতা, বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—সব শ্রেণির মানুষ তাঁর পাখির নীড়ে আসেন। সময় নিয়ে পাখিদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি। তিনি বললেন, ‘ভিজিটররা মেহমান। আগে একটু ফোন দিয়ে যে কেউ এখানে আসতে পারেন।’

সোহেল স্বপ্ন দেখেন
পোষা পাখি পালনে একদিন বাংলাদেশ বিশ্বসেরা হবে। সোহেলের পক্ষীশালা নতুন করে সাজানোর কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে চান তিনি। পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজও চালাচ্ছেন সমানতালে। এমনও স্বপ্ন দেখেন, পোষা পাখিতে দেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে। বললেন, পোষা পাখিতে প্রচুর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক ছেলে-মেয়ে পড়াশোনার টাকা পাখি পুষেই জোগাড় করতে পারে। বর্তমানে পাখির প্রতি যাদের অঘাত ভালোবাসা এমন পাখি প্রেমীদের পোষতে পাখি বিক্রি করে প্রতি মাসে প্রায় লক্ষাধীক টাকা আয় করি।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »



সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।