সোমবার ৬ জুলাই ২০২০ ২২ আষাঢ় ১৪২৭

অনুমতি ছাড়াই একাধিক শাখা
অনৈতিক ব্যবসা করছে সাউথ পয়েন্ট স্কুল ও কলেজ
করোনার মধ্যে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ায় নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছে সাউথ পয়েন্ট স্কুল
এম উমর ফারুক
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০, ৮:০২ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

অনৈতিক ব্যবসা করছে সাউথ পয়েন্ট স্কুল ও কলেজ

অনৈতিক ব্যবসা করছে সাউথ পয়েন্ট স্কুল ও কলেজ

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যে শিশুদের বাসা থেকে ডেকে এসে স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনার শিক্ষাবোর্ডের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছে স্কুল সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ। গতকাল সোমবার ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের কাছে এ ক্ষমা চায় তারা। তবে প্রতিষ্ঠানটি বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তি নেওয়া হবে তা ঠিক করতে আজ মঙ্গলবার বোর্ডের উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে শোকজের জবাব পর্যালোচনা এবং অভিভাবক, শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলবে বোর্ডের কর্মকর্তারা। 
 
শোকজের জবাব পাওয়া নিশ্চিত করে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মু. জিয়াউল হক স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সাউথ পয়েন্ট স্কুলের জবাব পেয়েছি। আজ তাদের জবাব পর্যালোচনা করে বোর্ড সিদ্ধান্ত নিবে। কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখনই এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারবো না। 

জানা গেছে, করোনা মহামারির মধ্যেই গত শনিবার ইংরেজি মাধ্যমে ১৯ জন শিশুদের বাসা থেকে ডেকে এনে ভর্তি পরীক্ষা নেয় সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের মালিবাগ শাখা। বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর ঢাকা শিক্ষাবোর্ড স্কুল কর্তৃপক্ষকে একদিনের সময় দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। গতকাল স্কুল পরিদর্শকের কাছে এ ঘটনার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে  শোকজের জবাব দিয়েছে। এদিকে গতকাল প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ এবং সভাপতিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডাকা হয়। 

পরীক্ষার বিষয়টি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হামিদা আলী স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে তিনি কিছুই জানতেন না। তিনি বলেন, ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা অনলাইনে পরীক্ষা না নিয়ে সরাসরি নেওয়ার জন্য শিক্ষকদের অনুরোধ করেন। শিক্ষকরা বিষয়টি উপরের কাউকে না জানিয়ে পরীক্ষাটি নিয়েছে। আমি জানলে সঙ্গে সঙ্গে না করে দিতাম। এ ধরনের ভুলের জন্য আমরা নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছি।

সাউথ পয়েন্ট স্কুল  ও কলেজ মালিবাগ শাখাকে ঘিরে অভিভাবকদের অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারী নিয়ম মানে না অথচ সরকারের শিক্ষাবোর্ড এবং শিক্ষা মন্ত্রনালয় কর্তৃক অধীভূক্ত ই,আই,আই,এন ধারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দাবি করছে। প্রাইভেট স্কুল-কলেজ নাম দিয়ে রক্তচোষার মত অভিভাবকদের কাছ থেকে লুটিয়ে নিচ্ছে টাকা। কিন্তু অভিভাবকদের সাথে জবাবদিহিতার কোন বালাই নেই। ৫ম এবং ৮ম শ্রেণিতে সরকারী বৃত্তিপ্রাপ্তদের কাছ থেকেও জোর করে হাতিয়ে নিচ্ছে মাসিক বেতন ৩০০০ করে।  যেখানে সরকারী গেজেটে বলা আছে বৃত্তিপ্রাপ্তদের মাসিক বেতন ফ্রী। এ বিষয়ে অভিভাবক ড.আব্দুস সাত্তার সাউথ পয়েন্ট স্কুল এন্ড কলেজের  অধ্যক্ষ  শামসুল আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা সরকারী নিয়ম মানিনা। আমরা প্রাইভেট শিক্ষা দেই। সরকারী অনুদান-সাহায্য নেই না।

অভিভাবক ড.আব্দুস সাত্তার অভিযোগ করেন, সরকারের অধীনে কত অনিয়মই  নিয়ম  হিসেবে চালাচ্ছে?  ভর্তি  ফি, সেশন চার্জ এবং মাসিক বেতন আকাশচুম্বী অথচ ঐ প্রতিষ্ঠানে লিফ্ট গুলো প্রায়ই থাকে অকেজো। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই।

এদিকে, খোজ নিয়ে জানা গেছে, অনুমতি ছাড়াই একাধিক শাখা ক্যাম্পাস খুলেছে সাউথ পয়েন্ট স্কুল ও কলেজ। রাজধানীতে শিক্ষা বাণিজ্যে নতুন আর্ভিভাব সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের। প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে গুলশান-১ এর ২২ নম্বর সড়কে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। পরবর্তিতে শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে একই এলাকার ৩ নম্বর সড়কে স্থানান্তর  করে। ২০০৭ সালের ৪ জুলাই বোর্ডের অনুমতিপত্রে তিনটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। শর্তগুলো হলো- বোর্ডের অনুমতি ছাড়া প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা পরিবর্তন করা যাবে না, আগামী দুই বছরের মধ্যে নিজস্ব জমি ও ভবনের ব্যবস্থা করতে হবে। কলেজ ভবনের কোন অংশই অন্য কোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

শর্ত লঙ্ঘন করে বোর্ডের তৎকালীন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ২০১১ সালের ১৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটি গুলশান হতে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় স্থানান্তরিত করা হয়। এ সময়ে আগের প্রথম দুটি শর্ত বহাল রাখা হয়। কিন্তু এই শর্ত লঙ্ঘন করে প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে গুলশান, উত্তরা, বনানী, মিরপুর, বারিধারায় শাখা ক্যাম্পাস খুলে শিক্ষা বাণিজ্য করছে। এ ব্যাপারে বোর্ড থেকে প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে কারণ দর্শানো হয়েছে।

জানতে চাইলে সাউথ পয়েন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা হামিদা আলী বলেন, বোর্ডের শোকজের জবাব দেওয়া হয়েছে। বাকী বিষয়গুলো চারজন অধ্যক্ষ আছেন, তারাই ভালো বলতে পারবেন।

বনানী শাখার অধ্যক্ষ উইং কমান্ডার (অব.) আমজাদ হোসেন বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান একই নামে বিভিন্ন ব্রাঞ্চ চালাচ্ছে, আমরাও সেভাবে চালাচ্ছি। অনুমোদন নিতে হবে জানার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আবেদন করেছি। এতদিন অনুমোদন ছাড়া শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে চালিয়েছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সবই মূল ব্রাঞ্চের অধীনে চলছে।

ঢাকা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর ড. মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার পরে ২০১৮ সালে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে আড়াই শতাধিক কলেজের নানা ত্রুটি ধরা পরে। কলেজের অধ্যক্ষরা ত্রুটি সংশোধনের মুচলেখা দিলে শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়। গত বছর ত্রুটিপূর্ণ কলেজের সংখ্যা ৫০টিতে নেমে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার কারণ দর্শানো হয়েছে। জবাবের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলছে। অবৈভভাবে কোন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না।

প্রতি বছর শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরিপ পরিচালনা করে। এই জরিপ চালাতে গিয়ে প্রাপ্যতার বাইরে প্রচুর প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার তথ্য উঠে আসে। তাই প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের ব্যাপারে কঠোর হওয়ার সুপারিশ করে ব্যানবেইস। যার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে কঠোর নীতিমালা জারি করে মন্ত্রণালয়। নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হলে সরকারের কাছে আবেদন করতে হবে। সরকার বোর্ডের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজন মনে করলে অনুমোদন দেবে। অতিরিক্ত শ্রেণি শাখা খোলার ক্ষেত্রেও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ব্যানবেইস ইআইআইএন নম্বর দেওয়া হবে না। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের কতিপয় কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের ঘুষের মাধ্যমে প্রাপ্যতার বাইরে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দিয়েছেন। এই সুযোগ নিয়ে শিক্ষা ব্যবসায়ীরা শাখা ক্যাম্পাস ও অতিরিক্ত শ্রেণি শাখা খুলে শিক্ষা ব্যবস্যা করছে।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »



সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।