শুক্রবার ৫ জুন ২০২০ ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

বেলা আড়াইটা
অনিন্দ্য কিশোর চৌধুরী
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২০, ৪:০৬ এএম | অনলাইন সংস্করণ

বেলা আড়াইটা

বেলা আড়াইটা


দিনগুলো কাটছে হেঁয়ালিপনা আর অবহেলায়। ঘুম ভাঙছে সকাল নয়টায় কি দশটায়। ঘুম ভাঙতেই রাস্তা থেকে ভেসে আসছে না কোনো বদমেজাজি গাড়িচালকের হর্নের আওয়াজ, আসছে না কোনো রিকশা-সাইকেলের টুংটাং। ইট-সিমেন্টের জঙ্গলে পক্ষীকুলের ‘সাধারণ ছুটি’ নেই। ওড়া-উড়ি, ডাকাডাকিতে ভোর হতে ব্যস্ত। বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাখিদের ব্যস্ততা আগে কখনো দেখা হয়নি কেন, এই প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছি না। ভোররাতের দিকে বৃষ্টি হচ্ছিল, বাতাসটা এখন বেশ ভারী আর ঠান্ডা। ‘মুরগি লইবেন মুরগি, দেশি মুরগি’—এই শব্দগুলোও হারিয়ে গেল কোথায় যেন। বুঝতে পারি না, এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো সব গেল কোথায়? কী করে চলছে এখন?

ঘর থেকে বের হয়ে দেখি বাবা কারও না কারও সঙ্গে কথা বলছে। দিনের এই সময়টায় কর্মব্যস্ততায় কাটিয়েছে বাবা সব সময়। হয়তো সহকর্মীদের সঙ্গে ফোনে ব্যস্ত থেকে সময়টাকে ভুলে থাকতে চাইছে। মাকে রান্নাঘরে গিয়ে উঁকি দেওয়ামাত্র মা ভ্যাক্সিন-নামা শোনাবে। আজকে কানাডা তো কালকে ইউরোপে তো পরশু ইংল্যান্ডে ভ্যাক্সিন বানানো শুরু হয়ে গেছে, কার্যকারিতা ৯ ০শতাংশ, আবার বাংলাদেশের ঔষধ প্রতিষ্ঠানই নাকি বানাচ্ছে। মানুষ আশায় বুক বাঁধে। মা ফেসবুকের লাইভ, উড়ো খবর, সত্য খবর মিলিয়ে মিশিয়ে বুক বাঁধছে। হয়তো এমন সব মায়ের আশা একদিন সত্যি হয়ে যাবে।


ভয়ে ভয়ে মোবাইল হাতে নিচ্ছি। ফেসবুকের নিউজ ফিডে এই বুঝি দেখব আমার প্রিয় কোনো পরিচিত মানুষের মৃত্যুসংবাদ ভাসছে। না, আজ আর আমার প্রিয় মানুষ কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়নি। কিছু অনলাইন গণমাধ্যমে যাচ্ছি, হেডলাইন দেখে আবার বের হয়ে যাচ্ছি। যাক আজকে আর কোথাও বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ হচ্ছে না, গত ২৪ ঘণ্টায় চালের বস্তা নিয়ে কেউ ধরাও পড়েনি। স্বস্তি! এখন পত্রিকাগুলোতে মজার পাতা হচ্ছে খেলার পাতা আর বিনোদনের পাতা। লকডাউনে দুটিই মোটামুটি বন্ধ, কিন্তু তারপরেও খবর প্রকাশনা বন্ধ নেই এই দুই জগতের। বৈচিত্র্যময় জগৎ!

বেলা গড়িয়ে আসছে। দুপুর বেজে গেল সোয়া দুইটা। বাসায় টিভিটা ছেড়ে দেওয়া হলো। কেন যেন উৎকণ্ঠা বোধ করছি। বাবাও বেশি একটা কথা বলছে না। টিভির দিকে মনোযোগ। বেলা আড়াইটা বাজতেই প্রতিদিন শুরু হচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিং। অধিদপ্তরের প্রশাসনিক প্রধান কথা বলছেন। ইশ! আবার মৃত্যু! হয়তো আক্রান্তের সংখ্যা কম হবে। না, আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পিপিইর সংখ্যা কমে আসছে, শনাক্তকারী কিটের মজুত কমে আসছে, গরিবের সঞ্চয় ফুরিয়ে আসছে, রোগীর সংখ্যা দিব্যি বেড়ে চলছে।

একধরনের শূন্যতা অনুভব করছি সবাই। আমরা ইতিহাসের অন্যতম বিপজ্জনক সময় পার করছি। এই যুদ্ধ শুধু শারীরিক নয় এখন, এই যুদ্ধ এখন ত্রিমুখী যুদ্ধ—শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক। দিন যত যাচ্ছে, অনিশ্চয়তার মেঘকে মনের আকাশে ঘনীভূত হতে দেখছি। মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানের অদম্য ছুটে চলাকে দমে যেতে দেখে আকাশের দিকে সবাই ফিরে তাকাচ্ছি।

‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ উপন্যাসের শেষ অনুচ্ছেদে থাকা গোবরে পোকার উপমার কথাটি মনে পড়ছে খুব। পোকাটি চিত হয়ে শুয়ে ছিল পাগুলো আকাশের দিকে দিয়ে। যদি আকাশ ভেঙে পড়ে, ভেঙে পড়া পা দিয়ে আটকে দিবে সেই আকাশকে। আমরাও সবাই মিলে আজ সেই গোবরে পোকার অবস্থায়। আকাশের ভেঙে পড়াকে থামতেই হবে এতগুলো পায়ের সামনে।

আবারও একদিন বেলা আড়াইটা বাজবে। সারা দেশ থাকবে টিভির সামনে। কোনো বাংলাদেশের খেলার জন্য নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিং শুরু হবে এ জন্য। নিশ্বাস আটকে থাকবে সবার। মীরজাদী সেব্রিনা খান ফ্লোরা শুরু করবেন প্রেস ব্রিফিং। তিনি বলবেন, ‘টানা ১৪ দিন দেশে কোনো করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়নি।’ বলামাত্রই তিনি সুখের, বিজয়ীর অশ্রুতে ভেঙে পড়বেন, মাক্সটি খুলে ফেলবেন। আরে সেকি, ম্যাডাম কাঁদছে কেন! আশপাশে থাকা কর্মকর্তারা বিব্রত হয়ে যাবে, টিস্যু বক্স খোঁজার হিড়িক পড়ে যাবে।

স্বামী তার স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরবে, মা তার সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে চুমু খাবে, বৃদ্ধ বাবার চোখ চশমার ভেতরে ঝাপসা হয়ে উঠবে। মাহমুদুল্লাহ্ রিয়াদের ছক্কার সময়ের মতোই ঘর থেকে হর্ষধ্বনি ভেসে আসবে। চোখের পলকেই রাস্তা দিয়ে বিজয় মিছিল যাওয়া শুরু করবে, বুভুজেলা বাজবে। সম্মুখযোদ্ধাদের বীরত্বকে স্যালুট জানাতে গগনবিদারি শব্দে উড়ে যাবে যুদ্ধবিমান।

আচ্ছা, আমি বেঁচে থাকব তো সেদিন?

লেখক: শিক্ষার্থী, প্রথম বর্ষ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »



সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।