মঙ্গলবার ৩১ মার্চ ২০২০ ১৫ চৈত্র ১৪২৬

করোনায় দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব
জোনায়েদ মানসুর
প্রকাশ: রোববার, ২২ মার্চ, ২০২০, ৬:৩১ পিএম | অনলাইন সংস্করণ

করোনায় দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব

করোনায় দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব


মহামারি করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। আমদানি-রফতানি থেকে শুরু করে ব্যাংক, বীমা, শেয়ারবাজার, উৎপাদন, পর্যটন, নিত্যপণ্য-ভোগ্যপণ্য ক্রয়-বিক্রয়সহ সব ক্ষেত্রে কার্যক্রম যেন থমকে গেছে। এতে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। একইভাবে প্রবাসী আয়ও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইতালির মতো বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে পণ্যের সাপ্লাই চেইন বন্ধ হয়ে যাবে। চরম সংকটে পড়বে দেশের অর্থনীতি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতিমধ্যেই তৈরি গার্মেন্টস শিল্পে বহু আদেশ বাতিল হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে তৈরি পোশাক, চামড়া, চা, হিমায়িত চিংড়ি ও পাটসহ যাবতীয় রফতানিজাত পণ্য। ফলে রফতানি খাতে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাছাড়া দেশের অন্যতম প্রধান খাত রেমিট্যান্সেও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির ওপর করোনাভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকভাবেই পড়বে। প্রথমত বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব। চীন, ভারত, ইউএস, ইউকে, ফ্রান্সসহ  যেসব দেশে আমদানি ও রফতানি করা হয় সেসব দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে সমস্যা হচ্ছে।  কী কী ক্ষতিগ্রস্ত হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রেমিট্যান্স, ট্যুরিজম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিঃসন্দেহে আমাদের প্রবৃদ্ধির ওপর অভিঘাত হানবে।’

সাবেক সচিব ও সাবেক রাষ্ট্রদূত আশরাফ উদ-দৌলা স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা মধ্যবিত্তের দেশে পরিগণিত হয়েছি। বিদেশে আমাদের সম্মান করে। এ পথ পাড়ি দিতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। সামনে আমাদের দীর্ঘপথ রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি সুস্থ ধারায় আছে। তবে বর্তমানে একটা সংকট দেখা দিয়েছে, সেটা হচ্ছে করোনা ভাইরাস। এতে অর্থনীতিতে একটি ধাক্কা লেগেছে। এ ধাক্কা মোকাবেলা করতে হবে সরকারকে। এ সমস্যা থেকে উত্তীর্ণ হতে পারলে বাংলাদেশ আরও অনেকদূর এগিয়ে যাবে।’

অর্থনীতিবিদ এইচ এম মনসুর আলী স্বদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনাভাইরাসের প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষার্থে সব রকম চেষ্টা চলছে। সরকারের পর্যায় থেকে সবরকম জরুরি ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি আশা করছেন, বাধাগ্রস্ত অর্থনীতি শিগগিরই সুস্থ ধারায় ফিরে আসবে।   
      
অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২০ সাল হবে অর্থনৈতিকভাবে আরও একটি দুর্বল বছর। করোনার প্রভাব ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের বড় মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতু, পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ, পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রেলসংযোগ, কর্ণফুলী টানেল ছাড়াও প্লাস্টিক খাত, ওষুধশিল্প ও খুচরা যন্ত্রপাতির বাজারে পড়তে শুরু করেছে। সরকারের রাজস্ব আদায়েও এই সংকট প্রভাব ফেলবে। এডিপি বাস্তবায়নের কাক্সিক্ষত হার অর্জিত হবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে রফতানি, পর্যটন ও যোগাযোগ খাত। দেশের অর্থনীতির মূল উদ্দীপক পোশাক রফতানি ও রেমিট্যান্স। শিল্পের কাঁচামালসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানির জন্য ভারত ও চীনের ওপর নির্ভরশীল সবচেয়ে বেশি। এই দেশগুলো করোনার কারণে লকডাউন অবস্থায় রয়েছে। এসব দেশের সঙ্গে পণ্য শিপমেন্টসহ সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ। কাঁচামালের অভাবে পোশাকশিল্প বন্ধের উপক্রম। ২০ মার্চ পর্যন্ত বিজিএমইএর সদস্য ১৭১ কারখানার ৩৮ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত করা ক্রেতাদের মধ্যে প্রাইমার্কের মতো বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানও আছে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। আয়ারল্যান্ডভিত্তিক প্রাইমার্কের পাশাপাশি ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত করেছে ইউরোপের ছোট-মাঝারি-বড় সব ধরনের ক্রেতাই।

জানা গেছে, কাঁচামালের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল বিশ্বের শীর্ষ ২০ ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশের চামড়া, পোশাক ও আসবাবপত্র শিল্প খাত বড় ক্ষতির মধ্যে পড়বে। এ তিন খাতের রফতানির অংশ মোট রফতানির ৮৫ শতাংশ। আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে চীনের কাঁচামাল রফতানি ২ শতাংশ হারে কমলে বিশ্বের ২০টি দেশের কী পরিমাণ ক্ষতি হবে তার হিসাব দেওয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চীনের রফতানি কমছে অনেক বেশি। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে চীনের রফতানি কমেছে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ। কমতির এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমবে প্রায় ১৪ কোটি ডলার বা ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সূক্ষ্ম ও মূলধনী যন্ত্রপাতি, অটোমোবাইল, যোগযোগকারী যন্ত্র, বৈদ্যুতিক যন্ত্র, রবার বা প্লাস্টিক, অফিস সরঞ্জাম, চামড়া, ধাতব দ্রব্য, কাগজ, রাসায়নিক সামগ্রী, পোশাক ও কাঠসামগ্রী খাতে রফতানি কমে যাবে। এছাড়া গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স শিল্প, কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিস শিল্প, তৈরি পোশাকের ওভেন খাত, লাইভ অ্যান্ড চিলড ফুড শিল্প, প্লাস্টিক শিল্প, ইলেকট্রিক্যাল মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারার্স শিল্প, চশমাশিল্প, জুট স্পিনার্স শিল্প, মুদ্রণশিল্প, ইলেকট্রনিক্স শিল্প, মেডিকেল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যান্ড হসপিটাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স, কম্পিউটার ও কম্পিউটার অ্যাক্সেসরিজ শিল্প রয়েছে মারাত্মক ঝুঁকিতে।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব)- এর সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান পর্যটন খাতে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারের কাছে ভর্তুকি দাবি করে বিশেষ তহবিল গঠন করার আহ্বান জানান। এ বিষয়ে গত ১৬ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনটি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘পর্যটন মৌসুমে আমাদের সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। করোনা ভাইরাসের কারণে পর্যটন খাতে কী পরিমাণ ক্ষতি হবে তা বলা সম্ভব না। তবে ৮০ শতাংশের মতো ট্যুর বাতিল হয়েছে। করোনার কারণে ট্যুর বাতিল হওয়ায় ট্যুর অপারেটররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ সব লোকসান আমাদের বহন করতে হচ্ছে। এ কারণে আমাদের ভর্তুকি দিতে হবে।        
                                                                     
এদিকে করোনাভাইরাস সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ দিকে গেলে বাংলাদেশ ৩০২ কোটি ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে এশিয়ার অর্থনীতিতে প্রভাব বিষয়ে সম্প্রতি এডিবির প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। এডিবির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বিশ্ববাসী সবচেয়ে ভালোভাবে করোনাভাইরাস সংক্রমণ সামাল দিতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে ৮০ লাখ ডলার। আর মোটামুটি ভালোভাবে অর্থাৎ সংক্রমণ তীব্র হওয়ার তিন মাসের মাথায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা গেলে বাংলাদেশের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে এক কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা জিডিপির দশমিক ০১ শতাংশ। এডিবি বলছে, করোনাভাইরাসের বিস্তার এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির ওপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পর্যটন, ভ্রমণ, বাণিজ্য ও উৎপাদনব্যবস্থায় ধাক্কা, অভ্যন্তরীণ চাহিদা হ্রাস, সরবরাহ ব্যাহত ও স্বাস্থ্যগত প্রভাবে এই ক্ষতি হবে। জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান আঙ্কটাড প্রতিবেদনে বলেছে, চীনের কাঁচামাল ও শিল্পের মধ্যবর্তী উপকরণের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর রফতানি ব্যাপকহারে কমে যাবে।

রফতানিতে ধাক্কা : অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রফতানির নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির এ ধারা শুরু হয়, আট মাস শেষেও যা অব্যাহত আছে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো অবশ্য আট মাসের রফতানি আয়ের তথ্য দিয়েছে। তাতে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারির চেয়ে রফতানি আয় কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। রফতানী উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বলছে, চলতি অর্থবছরের আট মাসে রফতানি কমেছে ৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ। অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি আট মাসে বিশ্ববাজারে ২ হাজার ৬২৪ কোটি ১৮ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয়েছিল ২ হাজার ৭৫৬ কোটি ২৭ লাখ ৯০ হাজার ডলারের পণ্য। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ১৩২ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার ডলারের রফতানি কম হয়েছে।

আমদানিতে ধাক্কা : ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৬১২ কোটি ১০ লাখ ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছিল বাংলাদেশ। করোনাভাইরাসের ধাক্কায় এই বছরের জানুয়ারিতে তা ৫৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। শতাংশ হিসাবে আমদানি কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) তিন হাজার ৪৫৮ কোটি ৪০ লাখ (৩৪.৫৮ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৬১৯ কোটি ১৫ লাখ (৩৬.১৯ বিলিয়ন) ডলার। এ হিসাবে এই সাত মাসে আমদানি ব্যয় কমেছে ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বাংলাদেশের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে শিল্প স্থাপনের ন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি কমেছে ২৮ দশমিক ৪১ শতাংশ। মধ্যবর্তী কাঁচামাল আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ।  ভোগ্যপণ্য আমদানি কমেছে ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ।

« পূর্ববর্তী সংবাদপরবর্তী সংবাদ »



সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন

প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।
ফোন: ৯৮৫১৬২০, ৮৮৩২৬৪-৬, ফ্যাক্স: ৮৮০-২-৯৮৯৩২৯৫। ই-মেইল : e-mail: [email protected], [email protected]
সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ওয়াকিল উদ্দিন
সম্পাদক: রফিকুল ইসলাম রতন
প্রকাশক: স্বদেশ গ্লোবাল মিডিয়া লিমিটেড-এর পক্ষে মোঃ মজিবুর রহমান চৌধুরী কর্তৃক আবরন প্রিন্টার্স,
মতিঝিল ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও ১০, তাহের টাওয়ার, গুলশান সার্কেল-২ থেকে প্রকাশিত।